মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ , ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০

modhura
Aporup Bangla

সাহিত্যে অতিপ্রাকৃতবাদ

শিল্প-সাহিত্য

খৈয়াম কাদের 

প্রকাশিত: ০৯:১১, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সর্বশেষ

সাহিত্যে অতিপ্রাকৃতবাদ

চিত্র: রনি বর্মন

ফরাসি কবি ও লেখক জেরার্ড ডি নেরভাল(Gerard de Nerval:Gerard Labrunie: 1808--1855) "১৮৫৪ সালে লেখা একটি বইয়ের ভূমিকায় 'অতিপ্রাকৃত' শব্দটি ব্যবহার করেন জাগতিক অভিজ্ঞতার অতীত বিষয় বর্ণনা করতে গিয়ে "। পরের বছর অর্থাৎ ১৮৫৫-তে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস Aurelia-তে তিনি ব্যক্ত করেন  " বস্তুজীবনের মধ্যে স্বপ্নের বন্যার প্রবেশের কথা"। এর অনেক পরে ফ্রান্সের আরেক প্রখ্যাত সাহিত্য -ব্যক্তিত্ব এ্যাপোলিনেয়ার (Guillame Apolinaire/Wilhem Albert Wlodzimierz Apolinary Kostrowicki: 1880--1918) মার্ক শাগালের (Marc Chagall: 1887--1985:France) চিত্রকলাকে বলেছিলেন 'পরাপ্রাকৃতিক'(supernatural) । ধ'রে নেয়া হয়েছিল "পরাবাস্তব বা পরাপ্রকৃতি দুয়েরই পিছনে আছে এই অভীপ্সা যে জাতিবিদ্যা ও কল্পনার মাধ্যমে সত্যে পৌঁছানো যায়, এবং তার ফলে মানবতার এক নতুন ছবি দেওয়া সম্ভব। এই আবিষ্কারে বিস্ময়কে খুব বড় জায়গা দেওয়া হয়েছিল " (তথ্যঋনঃআবদুল মান্নান সৈয়দ)। অতিপ্রাকৃতবাদের চারিত্রালোকে বলা যায় এর মূলে অবস্থান করে এক ধরণের কাল্পনিক বাস্তবতা, অধিদর্শনের অধ্যয়নে যাকে supernatural reality বা natural supernaturlism নামে অভিহিত করা হয়েছে। এর উৎস-প্রেষণা হিসেবে কাজ করে জাগতিক কার্যকারণ ও হৈতুকিতা বিরোধী উচ্চমার্গীয় এক কল্পনা-শক্তি। আর এই কল্পনা-শক্তির ভেতরে চিত্রিত অতিপ্রকৃতি বাস্তব-প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে একটি নতুন সত্যের জন্ম দেয়।  England-এর অন্যতম প্রধান romantic কবি John Keats একে নাম দিয়েছেন truth of imagination. মনে করা হয় এর ভেতরে সংস্থিত থাকে স্বতপ্রণোদনায় গ্রাহ্য হয়ে ওঠা অযৌক্তিক ও অনিশ্চিত কোনো মরমী রহস্যের সারাৎসার। সাহিত্য-শিল্পের এই অনন্য ধারাটির সবচেয়ে বড় অভিলক্ষ হলো পাঠকমনে, তথা মানবমনে আধ্যাত্মবাদী নীতিচেতনার(theo-moral spirit) এক সমাহিত আবেশ সৃষ্টি করা।অন্য কথায় এখানে ক্রিয়াশীল থাকে অবাস্তব কোনো কল্পচিত্রকে মনস্তাত্ত্বিক দৃশ্যমানতা ও বিশ্বাস্যতা প্রদান ক'রে তা থেকে এক ধরণের আনন্দ ও প্রশান্তি লাভের প্রয়াস। ফলে এধারার শিল্পকলা ও শিল্পকৌশলে সতত চর্চিত হয় 

hypnotism, mesmerism, magic-realism, dream-realism এবং mysticism-এর পাঠ।এইসব বিষয়ের অনুশীলন ও উৎকীর্ণনের জন্য এখানকার শিল্পিদেরকে স্বাভাবিকভাবেই মনোদার্শনিক, মনোবিজ্ঞানী ও মনোচিকিৎসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়।


পরাপ্রকৃতিবাদ বা অতিপ্রাকৃতবাদ সম্পর্কে Wikipedia -তে বলা হয়েছে --"In supernaturalism, the supernatural encompasses supposed phenomena that aren’t subject to the laws of nature. By definition, the supernatural requires a violation of physical law believed to have been attributed to interdimensional/extradimensional beings, such as angels, gods,spirits, etc.It also includes claimed abilities embodied in or provided by such beings, including magic, telekinesis,precognition and extrasensory perception". আর এ বিষয়ে Britannica -র সংজ্ঞা হলো --"Supernaturalism, a belief in an otherworldly realm or reality that, in one way or another,  is commonly associated with all forms of religion". অতিপ্রাকৃতবাদ নামের ধারণাটিকে সাহিত্যে প্রযুক্ত করণের ব্যাপারে Wikipedia আরো বলেছে --"Supernatural fiction or supernaturalist fiction  is a genre of speculative fiction that exploits or is centered on supernatural themes, often contradicting naturalist assumptions of the real world ". সাহিত্য-দর্শনের বিশ্ববীক্ষণ থেকে জানা যায় প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার কাল থেকেই সাহিত্যে অধিপ্রকৃতিবাদ বা অতিপ্রাকৃতবাদের প্রয়োগ শুরু হয়েছিল এবং তা ছিল ব্যাপক প্রভাব সঞ্চারী এক মনোদার্শনিক সাহিত্যীয় প্রচল। সেসময়ের যে কোনো সাহিত্যকর্মে দৃষ্টি ও যুক্তিগ্রাহ্য বাস্তব বিষয়ের সঙ্গে অবাস্তব ও অতিপ্রাকৃতিক কল্পদর্শনের মিশ্রন ঘটানো হতো। এটি ছিল গভীর মনস্তত্ত্ব চর্চার এক অনিবার্য শিল্পকৌশল। চিরকালীন মানবীয় আবেদন ও ধ্রুপদী সাহিত্য সৃষ্টির মহাকারিগর হিসেবে খ্যাত Homer-এর The Iliad এবং Helen of Troy, Hesiod-এর Theogony এবং Descent of Perithous, Sophocles-এর Oedipus Rex, Aeschylus-এর Agamemnon, Aristophanes-এর The Frogs, Euripides-এর Hippolytus Media এবং Dyonisus; এবং Apollonius,Anacreon, Pindar, Simonides, Theocritus,  Sappho, Stecichor, Hipponax, ও Alcman-এর কাব্যভাবনার সর্বত্র অভিব্যক্ত এবং অধিত হয়েছে পরাপ্রকৃতি ও পরাবাস্তবের বিমিশ্র জীবনবাদ ও নন্দনকলা। এঁদের সকলের সৃষ্টিতেই দৃশ্যমান বাস্তব প্রকৃতির মাঝে বিচরণরত মরণশীল ও সসীম শক্তির মানব-মানবীদের সঙ্গে যুগপৎভাবে ক্রিয়াশীল ক'রে তোলা হয়েছে দৃশ্যাতীত কল্পজগতের অমর ও অতিমানবিক দেবদেবী এবং তাদের অসীম শক্তিকে।পুরাণ ও রূপকথার রহস্যাবেশে চিত্রিত এইসব অতিপ্রাকৃতিক কল্পিত জীবগুলির চরিত্রে আরোপ করা হয়েছে বাস্তব জীবনের সকল মানবীয় বৈশিষ্ট্য।  ফলে প্রকৃতি ও অতিপ্রকৃতি এবং মানব ও অতিমানবের মধ্যে বোধগম্য কোনো তফাৎ সহজে সনাক্ত করা সম্ভব হয় না। 


বিস্ময় নামের বিশেষ অভিধাটিই সম্ভবত অতিপ্রাকৃতবাদের মৌল ভাব ধারণ করে। স্বপ্নকল্পের উদ্ভটতাবিষ্ট হলেও অসম্ভবের সম্ভবতায়, অবাস্তবের বাস্তবতায়,অবিশ্বাস্যর বিশ্বাস্যতায় এবং অদৃশ্যের দৃশ্যমানতায় মানব মন বিস্মিত হয়,চমৎকৃত হয়। তাই সে অবিশ্বাস্য এবং অবাস্তবকে কল্পিত বিশ্বাস ও বাস্তবতার সীমানায় হাজির করে মনস্তাত্ত্বিক আনন্দাশ্রয়ের অভিপ্রায়ে। মনাঙ্গনে কাম্য কিন্তু বাস্তবে অসম্ভব এমন কিছু নৈতিক ও সত্যাশ্রিত বিষয়কে অস্তিত্বশীল করার একটি প্রচেষ্টা এধরনের সাহিত্যে সর্বদাই পরিলক্ষিত হয়।আর এই ঘটনাটি এগিয়ে চলে এবং সম্পাদিত হয় স্রষ্টামনে সৃষ্ট এক ধরণের প্রত্যাশিত কারণ ও পরিনাম প্রক্রিয়ার পারম্পর্যতায়।মনোবৈজ্ঞানিক অধিচর্চার এই অতিপ্রাকৃতবাদী দর্শনটিকে আধুনিক সাহিত্যে প্রযুক্ত করেন Nerval, আর এর তাত্বিক এবং মনস্তাত্ত্বিক ব্যবহার সম্প্রসারিত করেন টমাস কার্লাইল(Thomas Carlyle :1795--1881: Scotland /England)। কিন্তু পরবর্তীতে (১৯১৭) এ্যাপোলিনেয়ার ও ব্রেতোঁ (Andre Robert Breton :1896--1966:Paris, France) দুজনই অতিপ্রাকৃতবাদ (supernaturalism) শব্দটির স্থলে পরাবাস্তববাদ(surrealism) অভিধাটিকে প্রতিস্থাপন করেন।এর পেছনে তাঁরা কিছু যুক্তিও উপস্থাপন করেন। কিন্তু দৃশ্যত পরাপ্রাকৃতবাদ ও পরাবাস্তববাদ প্রায় একই ধরনের ভাবাবহ ধারণ করে। ব্রেতোঁ পরাবাস্তববাদকে সংজ্ঞায়িত করেছেন পিউর সাইকিক অটোমেটিজম('pure psychic automatism')হিসেবে।অন্যদিকে অতিপ্রাকৃতবাদে মানব মনের অতিসূক্ষ্ণ কল্পনা ও মরমী বোধগুলি একটি স্পেকুলেটিভ(speculative) স্তরে উপনীত হয়;যেখানে দৃশ্যমান এবং দৃশ্যাতীত ঘটনাগুলি অনুমিত ও স্বপ্নাশ্রিত এক সমন্বিত সত্যরূপে স্থিত হয়।এই দর্শনে একে 'উইলিং সাসপেনসন অব ডিজবিলিভ'(willing suspension of disbelief) নামে অভিহিত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে শিল্পী এমন এক মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া প্রয়োগ করেন যাতে শিল্পের ভোক্তামনে অবাস্তব ও অবিশ্বাস্য বস্তগুলি বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। অর্থাৎ অবাস্তব, অসম্ভব, অযৌক্তিক এবং অবিশ্বাস্য বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের কোনো কথাই পাঠক মনে উদিত হয় না। বরং তাঁরা স্বেচ্ছায় (with auto-willingness) তাঁদের যুক্তিবোধ ও অবিশ্বাসের অনুভূতিকে নিষ্ক্রিয় ক'রে রাখেন। তাহলে বলা যায় পরাপ্রকৃতিবাদ ও পরাবাস্তববাদ মূলত একই অধিচেতনার দু'টি ভিন্ন দিক। এদের উভয়ের মধ্যে অবস্থান করে অসম্ভবতা,অযৌক্তিকতা এবং অবিশ্বাস্যতার গ্রাহ্য অস্তিত্ব। আর প্রকৃতি বহির্ভূত এই অবাস্তবতার ভেতরে নীরবে নিহিত থাকে আধ্যাত্মিক সংবেদ,মরমী বিভাব এবং নৈতিক প্রত্যয় যা মানবাত্মার এক শাশ্বত আকর।


ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা রোমান্টিক কবি S.T.Coleridge -এর বিখ্যাত কবিতা The Rime of the Ancient Mariner, মহাকবি John Milton-এর ক্লাসিকাল এপিক Paradise Lost, Edmund Spenser-এর রোমান্টিক এপিক The Faerie Queen, Alexander Pope-এর মক এপিক The Rape of the Lock, Christopher Marlowe-এর কালজয়ী ট্রাজেডি Dr.Faustus এবং William Shakespeare-এর প্রায় সকল নাটকেই প্রত্যক্ষীভূত হয় অতিপ্রাকৃতবাদের সফল প্রয়োগ। এছাড়া Tennyson, Browning, Arnold, Blake, Wordsworth, Keats,O' Neill,Hardy,Kyd,Emely Bronte এবং সাম্প্রতিক সময়ের Toni Morrison ও Chinua Achebe-সহ অনেক বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকের সৃষ্টিকর্মে নানা ব্যঞ্জনায় বিভাসিত হয়েছে অধিপ্রাকৃতিক বিষয়-আশয়। বহুকালের পুরোনো এই বিশেষ সাহিত্য-দর্শনটির মূল প্রবনতায় বহমান রয়েছে রহস্যকেন্দ্রিক মরমীবাদ। স্রষ্টা-সৃষ্টির সাংরাহস্যিক সম্পর্কের অধিপাঠ চর্চার মাধ্যমে এই দর্শনটি অতীন্দ্রিয়বাদী আধ্যাত্ম-চেতনার উদ্ভাসন ঘটাতে প্রয়াসী। ফলে অতিপ্রাকৃতবাদী সাহিত্যে pantheism,mysticism এবং spiritualism-এর একটি সমন্বিত শিল্পবয়ন নির্মিত হয়। মানব মননের অন্তর্দেশ স্পর্শকারী এইসব theo এবং psychosophic সাহিত্যশিল্পগুলি ধ্রুপদী আবেদন সৃষ্টিতে সতত সক্ষম। কারণ এই ঘরানার সাহিত্য একদিকে যেমন মানুষের আবেগে আলোড়ন সৃষ্টি করে,আরেকদিকে ঠিক তেমনি মনন ও মনীষাকেও করে সঞ্জীবিত শীলিত এবং শাণিত। 


লেখক : উপাধ্যক্ষ,সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া। 

জ.ই

সর্বশেষ

জনপ্রিয়