বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪ , ২ শ্রাবণ ১৪৩১

modhura
Aporup Bangla

আমার গুরুগণ: যাঁদের পাখায় আমি পথ চলি : প্রথম পর্ব

শিল্প-সাহিত্য

মোস্তফা মোহাম্মদ 

প্রকাশিত: ১০:২০, ১ ডিসেম্বর ২০২২

সর্বশেষ

আমার গুরুগণ: যাঁদের পাখায় আমি পথ চলি : প্রথম পর্ব

অলংকরণ : জীবন শাহ

কোমর-দোলানো ইউ-আকৃতির করতোয়া নদীর বাঁকেবাঁধা খেয়াঘাট পাড়ি দিয়ে আমার প্রিয় ফুলবাড়ি গ্রামের লাগোয়া চকপাথালিয়া প্রাইমারি স্কুলের মায়া ত্যাগ করে উলিপুর প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হলাম। শেরপুর পৌর-শহরের অন্যতম স্কুল উলিপুরের নাম চারদিক। স্কুলবিল্ডিং কিংবা শেরপুর শহর অথবা শেরপুর থানা-লাগোয়া ঢাকা-দিনাজপুর মহাসড়ক সন্নিকটস্থ স্কুল বলে নয়। উলিপুর স্কুলের নামটি ছড়িয়ে পড়েছিলো একজন শিক্ষকের বদান্যতায়--তিনি রহমতুল্লাহ সরকার। আমার প্রাইমারি জীবনে গড়েওঠার কারিগর, দোর্দণ্ড-প্রতাপশালী প্রধান শিক্ষক। তিনি আমাকে আকাশে ওড়ার পাখা দিলেন। বাংলা-ইংরেজি ব্যাকরণ, কবিতা, ভূগোল, ইতিহাস, অংকশাস্ত্রসহ বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি ঢুকিয়ে দিলেন আমার মাথায়। 

ষান্মাসিক পরীক্ষার আগেই টের পেলাম যে, আমি এই স্কুলের এতদিনের ক্লাসের ফাস্টবয় আমার ক্লাশমেট আবদুল মান্নান বাবলুকে পেছনে ফেলে ফাস্ট হচ্ছি। স্কুলে ভর্তি হয়েই আমি কেন-যেন ক্লাসের বন্ধুদের ঈর্ষার কারণ হয়ে যাই--কী দোষ আমার, খুঁজে দেখার চেষ্টা করি: আমি নদীর ওপারের গ্রাম থেকে আসা আবাল ছেলে! কেন ভালো লেখাপড়া করি। আরেকটি কারণ আমি অনুধাবন করি যে, ক্লাসের অধিকাংশ বান্ধবী আমাকে তথাকথিত ভালো ছাত্র হিসেবে বেশ পাত্তা দেয়। ছেলেদের একটা গ্রুপ আমার সাথে পায়ে পড়ে ঝগড়া বাধানোর চেষ্টা করে যায়।

স্কুল ছুটি হলে দত্তপাড়া-ঘোষপাড়া পাড়ি দিয়ে নদী পাড় হয়েই যাতায়াত করি। এভাবেই কেটে যায় তিনমাস। আমি আমার গ্রামের বন্ধু এনামুল, সাইদুল, জাবেদ আলিকে স্কুল পরিবর্তনে রাজি করাই। আমার দল ও জোর ভারি করা এবং নিরাপত্তাহীনতার কথা প্রধান শিক্ষক রহমতুল্লাহ  স্যারকে জানাতেই উনি ভর্তি করতে রাজী হয়ে গেলেন। আমার দল ভারি হয়ে গেলো। আমি চুটিয়ে পড়াশোনা, খেলাধুলা চালিয়ে যেতে থাকি। পড়াশুনায় স্কলার না হলেও আমার সহযোদ্ধা-বন্ধুরা আমার ভালো চাইতো, আমার উন্নতি কামনা করতো। ষান্মাসিক পরীক্ষায় আমি ক্লাসের ফাস্টবয় মান্নানকে ১৩০ নম্বরের ব্যবধানে পেছনে ফেলে ফাস্ট হয়ে গেলাম। নদীপাড়ের ফুলবাড়ি গ্রামের এই আনস্মার্ট স্কুলপড়ুয়া বালকের খ্যাতি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে সারা পৌরসভায় ছড়িয়ে পড়ে। স্কুলের বন্ধুদের একাংশ আমার অর্ধাংশ মান্নানের দিকে চলে যায়। বান্ধবীরা আমার পাল্লাকে ভারি করে তোলে। আগমনী, বুলবুলি, কস্তুরি, রমা, মিনতি, ইতি, আয়েষা, হেনাসহ অনেক নামজানা, হারিয়ে যাওয়া বান্ধবী আমাকে প্রাইমারি স্কুলজীবনে উপকারী বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিলো--আজও মনে পড়ে খুব। এদের বিচার-বুদ্ধি প্রখর ছিলো। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র এদের কাছে মুখ্য ছিলো না; মানুষ সবার বড়। এরা সেই বয়সে এই মহৎ শিক্ষা কীভাবে লাভ করেছিলো আজ মনে মনে ভাবি। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নদীপাড়ের ফুলবাড়ি গ্রামের এই আমি আমার প্রিয়শিক্ষক রহমতুল্লাহ সরকারের একান্ত পরিচর্যায় ক্লাস ফাইভে টেলেন্টপুলে বৃত্তি পেয়ে শেরপুর ডিজে হাইস্কুলের ভর্তি পরীক্ষায় একশোতে নিরানব্বই পেয়ে মহৎপ্রাণ প্রধান শিক্ষক নাজির আহমেদের তত্ত্বাবধানে ভর্তি হই। 

আমার বাবা ইসমাইল হোসেন মণ্ডল সাহেব হেড স্যারের মুখোমুখি হতেই স্যার ভর্তি পরীক্ষার খাতা দেখিয়ে আমার গুণকীর্তন করলেন। স্কুলের গেট থেকে বেরিয়েই নারাণ ঘোষের বিখ্যাত কাঁচাগোল্লার দোকানে ঢুকিয়ে দোকানের মালিক আমার বাবার বন্ধু নারাণ কাকাকে কাঁচাগোল্লা, রসকদম, রসস্বর দিতে বললেন। কলাপাতায় পরিবেশিত, অমৃততুল্য মিঠাইয়ের স্বাদে তৃপ্ত হয়ে বাড়ি ফিরলাম বাবার সাথে। মিষ্টির দোকান থেকে বের হবার কালে বাবা তার বন্ধু নারাণ কাকাকে বললেন, 'আমার ছেলে যা খাবে, তুমি লিখে রেখো; আমি মাস শেষে শোধ করবো' বাবার আস্কারা, আমাকে আর পায় কে! আমি বন্ধুদের নিয়ে চালিয়ে যেতে থাকি আমার দুষ্কর্ম। আমার কৃষক বাবা অসহায়ের মতো মাসান্তে শোধ করতেন আমার মিষ্টির বিল। বাবা কোনোদিন আমাকে অভিযোগ করেননি, তার বন্ধুর কাছে নিজে ছোট হননি, পুত্রের কাছে নত হননি। প্রিয়শিক্ষক রহমতুল্লাহ সরকারের দেয়া পাখায় আমি শেরপুর ডিজে হাইস্কুলের চত্তর জুড়ে উড়তে থাকলাম।

 (চলবে)

জা,ই

সর্বশেষ