চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে ভিনদেশী উন্নতজাতের আম | বিজনেস | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮
বিজনেস
নতুন সম্ভাবনার দ্বার উম্মোচিত

চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে ভিনদেশী উন্নতজাতের আম

রেজাউল করিম খোকন

প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২১ ১৩:১৩ আপডেট: ১৬ জুন ২০২১ ১৩:১৪

রেজাউল করিম খোকন | প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২১ ১৩:১৩


 চট্টগ্রা মের পার্বত্য অঞ্চলে ভিনদেশী উন্নতজাতের আম চাষ হচ্ছে

চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে ভিনদেশী উন্নত জাতের আমের সফল উৎপাদন হচ্ছে। ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, পাকিস্তানের উন্নতজাতের আম উৎপাদন করে সফল হয়েছেন স্থানীয় আমচাষী এবং বেশ কি এগ্রো প্রতিষ্ঠান । প্রাথমিক অবস্থায় স্থানীয় আম চাষী, এগ্রো প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলগুলোর মধ্যে বান্দরবান, লামা, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, কাপ্তাইসহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় আবাদ করে পরীক্ষামূলকভাবে উন্নতমানের আমের চাষ শুরুকরে প্রায় ২৩ বছর আগে থেকে। চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকাগুলো উন্নতজাতের আম চাষের উপযোগী হওয়ায় আম চাষীরা লাভের মুখ দেখতে পায়। তারপর ধীরে ধীরে গড়ে উঠে অসংখ্য আমের বাগান। বর্তমানে চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে ছোট বড় সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার আমের বাগান রয়েছে। এসব বাগানে প্রায় ৩০ হাজার লোক কর্মরত আছে। বিভিন্ন এগ্রো প্রতিষ্ঠান পার্বত্য অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ এগিয়ে আসায় এটি বর্তমানে একটি সম্ভাবনাময় লাভজনক, সম্ভাবনায় কৃষি এবং শিল্প উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। ১৯৯৭ সাল থেকে পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত আমের মধ্যে রয়েছে আম্রপালী, মলি¬কা, রাংগুয়াই, হাড়িভাঙ্গাঁ, থাই কাঁচামিঠা, থাই নামডাকমাই, ফনিয়া, থাই ব্যানানা জাতের আম। চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে উন্নত জাতের আম্রপালী চাষ করে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছেন স্থানীয় আম চাষীরা। আমাদের দেশে এখন আমের মৌসুম চলছে। অতুলনীয় ও ভিন্ন স্বাদের পাহাড়ি বিদেশি জাতের আম ইতোমধ্যে বাজারে চলে এসেছে। চট্টগ্রাম শহরসহ রাজধানী ঢাকার বাজারেও মিলছে দেশের পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত এসব বিদেশি জাতের আম। বিগত বেশ কয়েকবছর ধরে রাজশাহী অঞ্চলের আমের একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করেছে তিন পার্বত্য জেলায় উৎপাদিত উন্নত মানের বিদেশি সুস্বাদু আম। বর্তমানে ছোট বড় মিলিয়ে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি এবং প্রান্তিক পর্যায়ের বহু উদ্যোক্তা-চাষী পাহাড়ে আমের আবাদ করছেন। তিন পার্বত্য জেলায় খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের মধ্যে বেশির ভাগ আম বাগান রয়েছে বান্দরবানে। এখানেই রয়েছে কৃষিভিত্তিক বড় বড় এগ্রো ফার্মগুলোর ফলের বাগান।

সাড়া জাগিয়েছে নতুন জাতের আম

পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত আমগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে খুব মিষ্টি, সুস্বাদু , আঁশবিহীন, ছোট আটিযুক্ত। এসব আম ভারতীয় আমের তুলনায় উন্নত হওয়ায় ক্রেতারা এসব আমের প্রতি ঝুঁকছেন। দিন দিন এসব আমের চাহিদা কেবল বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে এত ব্যাপক পরিমাণে আম উৎপন্ন হচ্ছে , যা শিল্পের রূপ নিতে যাচ্ছে। রাঙামাটি, কাপ্তাই, বান্দরবান, লামা, খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি, মাটিরাঙাসহ তিন পার্বত্য জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছোটবড় বহু আমের বাগান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে ভিন দেশি সুস্বাদু উন্নতমানের আম উৎপাদনের ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে মেরিডিয়ান এগ্রো। তাদের উৎপাদিত আমারে মধ্যে রয়েছে ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভিয়েতনামি জাতের আম। মেরিডিয়ান এগ্রো সর্বমোট ৩২ জাতের আমের চাষ করে যাচ্ছে। তারা ১৯৯৭-৯৮ সালের দিকে ভারত থেকে চারা এনে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে আম্রপালি জাতের আমের চাষ শুরু করেছিলো। আম্রপালী ভারতীয় জাতের আম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট বারী আম-৩ জাত হিসেবে আম্রপালীকে অবমুক্ত করেন। প্রথম পর্যায়ে এই আমের জাতের চারার সঙ্কটের কারনে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষি মন্ত্রাণালয়ের অর্থায়নে প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত থেকে ১৯৯৬ সালের দিকে সর্বপ্রথম এই আম্রপালী আমের চারা আমদানী করে এবং কৃষক পর্যায়ে বিনামূল্যে বিতরন করে। আম্রপালী আমের চাষ চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে ব্যাপকভাবে চাষাবাদ করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলগুলোর মধ্যে বান্দরবান, লামা, খাগড়াছড়ি, রামগড়, কাপ্তাই, চন্দ্রঘোনা এলাকায় বেসরকারী উদ্যোগে আম্রপালী আমের চাষ করা হচ্ছে। মার্চ এপ্রিল মাসের দিকে আম্রপালী আমের মুকুল আসে। জুন-জুলাই মাসের দিকে ফলন আসে। সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে চারা রোপনের তিন বছরের মধ্যে গাছে ফলন আসা শুরু করে। প্রথম পর্যায়ে গাছ ছোট থাকায় গড়ে গাছ প্রতি পাঁচ থেকে ছয় কেজি আম উৎপন্ন হয়। পর্যায়ক্রমে গাছের বর্ধনের পর গাছপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ কেজি আম উৎপন্ন হয়। আম্রপালী আম উৎপাদনের জন্য চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলের মাটি এবং আবহাওয়া খুবই উপযোগী। ইতিমধ্যেই আম্রপালী পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে প্রতি আমের মৌসুমে ১৫ থেকে ২০ হাজার মেট্রিক টন আম্রপালী আম উৎপন্ন হচ্ছে। এই পার্বত্য অঞ্চলে ব্যাপক ভিত্তিতে আম্রপালী আমের চাষ করলে দেশে আমের সংকট দূর হবে এবং বিদেশে আম রপ্তানী করা সম্ভব হবে। বিদেশ থেকে আম আমদানী বন্ধ হয়ে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।
বেশ কয়েকজন বাগান মালিক ও স্থানীয় আম চাষীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সুস্বাদু ও বছরের ৪/৫ মাস ধরে স্থানীয় বাজারে পাওয়া যায় বলে ভিনদেশি আমের চাহিদা দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের আমের বাজারের সঙ্গে বেশ দাপটের সঙ্গেই পাল্লা দিচ্ছে পাহাড়ে উৎপাদিত ভিন দেশি নানা জাতের আম। আমের মৌসুমে প্রতিটি আম গাছ থেকে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ কেজি আমের ফলন পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এসব আম অত্যন্ত সুস্বাদু, মিষ্টি, আঁশবিহীন, পাতলা আঁটির চামড়াও বেশ পাতলা। ঘ্রাণও দারুণ এবং অতুলনীয় বলা যায়। আমাদের এখানকার ক্রেতাদের মধ্যে পার্বত্য জেলার উৎপাদিত বিদেশি নানা জাতের আমের ব্যাপারে তুমুল আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারা এসব আম ইতোপূর্বে খেয়ে পরিতৃপ্তি লাভ করেছেন। ফলে তারা বাজারে এসে পাহাড়ি এলাকায় উৎপাদিত আমের খোঁজ করছেন। উৎপাদিত ভিন্নদেশি বিভিন্ন জাতের এসব আম বর্তমানে চট্টগ্রাম ও ঢাকা শহরের সুপারশপ ছাড়াও বিভিন্ন এগ্রো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রে পাওয়া যাচ্ছে। অনলাইনেওএসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রে পাওয়া যাচ্ছে। অন লাইনেও এসব প্রতিষ্ঠান থেকে আম কেনার চমৎকার সুযোগ রয়েছে। এখন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা অনলাইনে যোগাযোগ করে পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত আম কিনছেন। অতিরিক্ত খরার কারণে এবার আমের উৎপাদন সন্তোষজনক পরিমাণে হয়নি।


পার্বত্য অঞ্চলে উন্নত জাতের আম উৎপাদনে আম চাষীদেরকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচেছ। এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে আম উৎপাদনে প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব, পর্যাপ্ত কীটনাশকের অভাব, সারের অভাব, দুর্গম পাহাড়ে যাতায়াতের অসুবিধা, বিদ্যুৎ সমস্যা, কৃষি ঋণের দু¯প্রাপ্যতা, বাজারজাতকরন সমস্যা, সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব, আম প্রক্রিয়াজাতকরন ব্যবস্থার অভাব সহ বিভিন্ন সমস্যা । আম সংরক্ষনের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় উৎপাদিত আম পঁেচ নষ্ট হয়ে যায়। এতে আম চাষীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হন। আমচাষীরা আমের ন্যায্য দাম পায়না। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলে আমের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা না থাকায় প্রতি বছর হাজার হাজার টন আম পচে নষ্ট হয়ে যায়। আমচাষীরা এবারও আম নষ্ট হওয়ার সমস্যায় ভূগছেন। আমচাষীদের প্রধান দাবী , পার্বত্য অঞ্চলে আমের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে তোলা। এ ব্যাপারে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ আশা করছেন আম চাষীরা। পার্বত্য অঞ্চলে আমের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠলে আমের অপচয় কমবে। আমচাষীরা আম উৎপাদন করে ন্যায্য মূল্য পাবে। সরকার ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান পার্বত্য অঞ্চলে শিল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমের বিভিন্ন প্রোডাক্ট তৈরী করতে পারেন। এতে সবাই উপকৃত হবে। চট্টগ্রামসহ তিন পার্বত্য জেলায় হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) নির্মাণ করা গেলে পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত আম সারা বছর ধরে খেতে পারবে মানুষ। পাহাড়ি এলাকার আম চাষীদের জন্য স্বল্পখরচে পরিবহন সুবিধা ও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে পাহাড়ি এলাকায় আম উৎপাদনে দারুণ এক বিপ্লব ঘটতে পারে। আমের জুস প্রক্রিয়াকরণসহ আমের বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু খাবার তৈরির কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে পার্বত্য জেলায় উৎপাদিত আমের বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো যায়। চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে উন্নত জাতের আম উৎপাদনে সরকারের পক্ষ থেকে কারিগরি সহযোগীতা প্রদান, স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগের ব্যবস্থা বিদ্যুতের ব্যবস্থা এবং আম সংরক্ষণের ব্যাপারে উপয্ক্তু ব্যবস্থা গ্রহন করলে আমাদের দেশ আম উৎপাদনে স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়ে উঠবে। আমের জন্য আর বিদেশের উপর নির্ভর করতে হবে না। উন্নতজাতের আম চাষ এবং উৎপাদন একটি লাভজনক, সম্ভাবনায় কৃষি উদ্যোগ এবং শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে।

 

 




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top