প্রাইম ব্যাংক ছাড়লেন রাহেল আহমেদ | বিজনেস | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮
বিজনেস

প্রাইম ব্যাংক ছাড়লেন রাহেল আহমেদ

অপরূপ বাংলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০ ডিসেম্বর ২০২০ ১৩:১০ আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০২০ ১৪:০৪

অপরূপ বাংলা প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ১০ ডিসেম্বর ২০২০ ১৩:১০


রাহেল আহমেদ

ব্যাংকার হিসেবে অভিজাত ও অহংকারী ছিলেন  বলে অভিযোগ আছে। বসবাস করতেন গুলশানের অভিজাত হোটেলে। হোটেল থেকেই আসতেন ব্যাংকে, আবার ফিরে যেতেন হোটেলে। ২০১৭ সালের শেষের দিকে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে প্রাইম ব্যাংকের বহু স্মৃতি বিজরিত মতিঝিলের আদমজি কোর্ট ভবনের প্রধান কার্যালয়ে আর আসেননি। দাপ্তরিক কাজ  করতেন গুলশানের অভিজাত ভবন ‘সিম্পল ট্রি আনারকলি’তে বসেই।  জানা গেছে,ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় বিদেশী ব্যাংকে চাকরি করা রাহেল আহমেদ নিজেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকার’ পরিচয় দিতেন  শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রাইম ব্যাংককেও সেভাবে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন।এজন্য ছাঁটাই করেছিলেন পুরনো কর্মীদের। পুনর্গঠনের পেছনে খরচ করেছিলেন ব্যাংকের বহু অর্থ।

কিন্তু তিন বছরে উন্নতি তো দুরে থাক প্রাইম ব্যাংকের হারানো গৌরব ফেরাতে পারেননি। বরং অতীতের চেয়ে স্থবির হয়ে পড়েছিল ব্যাংকটি। এমন অবস্থায় মেয়াদ পূরনের ছয় দিন আগেই তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছে রাহেল আহমেদকে। দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ পাচ্ছেন না, এটি নিশ্চিত হয়ে মঙ্গলবার পদত্যাগ করেন তিনি।

যদিও রাহেল আহমেদ বলছেন, অপেক্ষাকৃত ভালো জায়গায় যাওয়ার জন্যই তিনি প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।

গনমাধ্যমেকে তিনি বলেন, গত  ছয় বছর আমি প্রাইম ব্যাংক পরিবারের অংশ ছিলাম। ডিএমডি ও এমডি হিসেবে আমি যে পরিবর্তন চেয়েছিলাম, প্রাইম ব্যাংকে তা হয়েছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আমি সফল ও সন্তুষ্ট। পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রাইম ব্যাংকের মানবসম্পদসহ বিভিন্ন বিভাগ ঢেলে সাজানো হয়েছে। এজন্য অনেকে চাকরি ছেড়ে গেছেন। আমরা যোগ্যদের নিয়োগ দিয়েছি। প্রাইম ব্যাংক বর্তমানে যে অবস্থায় আছে, এখান থেকে বড় ধরনের সফলতার পথে যেতে পারবে।

একসময় বড় ব্যবসায়ীদের ভরসাস্থল ছিল প্রাইম ব্যাংক। করপোরেট বিনিয়োগে ব্যাংকটির ছিল শক্তিশালী ভিত। রিটেইলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সেবা উদ্ভাবনের জন্যও প্রশংসিত ছিল ব্যাংকটি। সব মিলিয়ে সমসাময়িক অন্য ব্যাংকগুলোর তুলনায় বেশ এগিয়ে ছিল প্রাইম ব্যাংক। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে ব্যাংকটি এখন বিবর্ণ।

২০১৫ সালে প্রাইম ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে নিয়োগ পান রাহেল আহমেদ।এর আগে সাত বছর তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে দুটি ব্যাংকে চাকরি করেন। তারও আগে দেশে চাকরি করেছেন বহুজাতিক ব্যাংক এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে। সব মিলিয়ে রাহেল আহমেদের ক্যারিয়ারের বড় সময়জুড়ে ছিল বিদেশী ব্যাংক। ডিএমডি হিসেবে প্রাইম ব্যাংকে যোগদানের পর ব্যাংকটির বিজনেস মডেল পুনর্গঠন ও সেন্ট্রালাইজেশনের দায়িত্ব নেন। ২০১৭ সালের মধ্যেই এ পুনর্গঠন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা শেষ করতে পারেনি ব্যাংকটি, যার খেসারত গুনেছে প্রাইম ব্যাংক।

পাঁচ বছর ধরে অস্বাভাবিক স্থবিরতা বিরাজ করছে প্রাইম ব্যাংকে। থমকে গেছে ব্যাংকটির আমানত ও সম্পদের প্রবৃদ্ধি।হতাশাজনক পরিস্থিতি ব্যাংকের মুনাফায়ও।

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিস্তর ব্যবধান তৈরি হওয়ায় প্রাইম ব্যাংকের বড় গ্রাহকরা ব্যাংকটি ছেড়ে যেতে শুরু করেন। ব্যাংকটির খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণের পরিমাণও বাড়ছে ক্রমাগত।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৩২ শতাংশ অথচ এ সময়ে প্রাইম ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। চলতি বছরের এখন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। কিন্তু ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, প্রাইম ব্যাংকের ঋণে প্রবৃদ্ধি না হয়ে উল্টো কমেছে। যদিও এ সময়ে সরকার ঘোষিত প্রণোদনার ঋণ বিতরণ করতে হয়েছে ব্যাংকটিকে।

ঋণের প্রবৃদ্ধির চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি প্রাইম ব্যাংকের আমানতে ২০১৪ সাল শেষে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা। সাড়ে পাঁচ বছর পর চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে আমানতের পরিমাণ ২২ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। মাঝে চার বছর প্রাইম ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক।

প্রাইম ব্যাংকের পরিচালন ও নিট মুনাফার প্রবৃদ্ধিতেও ভাটা পড়েছে ২০১৪ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৬১৫ কোটি টাকা। এরপর টানা চার বছর প্রাইম ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ৬০০ কোটি টাকার নিচে। ২০১৯ সালে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ২১ শতাংশ কমেছে।

পরিচালন মুনাফার চেয়েও খারাপ চিত্র নিট মুনাফায়। ২০১৪ সালে ২৩৯ কোটি টাকা নিট মুনাফায় ছিল প্রাইম ব্যাংক তার পর থেকে এখন পর্যন্ত ব্যাংকটির নিট মুনাফা আগের পরিস্থিতিতে ফেরেনি। উল্টো চলতি বছরের প্রথমার্ধে প্রাইম ব্যাংকের নিট মুনাফায় ৪৭ শতাংশ পতন হয়েছে।

লোকসান গুনছে প্রাইম ব্যাংকের দুটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানও, যা দুর্বল করে দিচ্ছে ব্যাংকের ভিত একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ বাড়ছে প্রাইম ব্যাংকের। আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো দেখাতে প্রতিনিয়ত খেলাপি ঋণ অবলোপনের পথে হেঁটেছে ব্যাংকটি। ২০১৯ সাল শেষে মামলায় আটকা পড়েছে প্রাইম ব্যাংকের খেলাপি ও অবলোপনকৃত ৩ হাজার ১৯৭ কোটি টাকার ঋণ। সব মিলিয়ে রাহেল আহমেদের হাতে প্রাইম ব্যাংকের ভিত দুর্বল হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top