মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের শক্তি ও ক্ষমতা | মতামত | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮
মতামত

মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনের শক্তি ও ক্ষমতা

টুটুল রহমান

প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল ২০২১ ১০:৫২ আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২১ ১০:৫৪

টুটুল রহমান | প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল ২০২১ ১০:৫২


লেখক

লেখাটা শুরুতেই নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। বছর দশেক আগের ঘটনা। আমি তখন একটা পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে কাজ করছি। আমার কাজের ক্ষেত্র ছিল ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতি। ওই পত্রিকার সম্পাদক এখন বিরাট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। টেলিভিশনের পর্দায় দেখবেন জাতিকে প্রতিদিনই কিছু না কিছু ওয়াজ নসিহত করেন। সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য জান দিয়ে দেন।
তো তিনি বললেন, একটা বেসরকারি ব্যাংকের কিছু অনিয়মের কাগজপত্র এসেছে। কাল একটু ওই ব্যাংকের গিয়ে এমডির সাথে কথা বলে রিপোর্টটা তৈরি করো। পরদিন এমডির সাথে কথা হলো, রিপোর্ট হলো এবং বিকালের মধ্যেই সম্পাদকের কাছে সেটা জমা দিলাম। সন্ধ্যায় আনমনে বসে আছি ডেস্কে। হঠাৎ এক ভদ্রলোক ঢুকলেন এবং আমার এক সিনিয়রকে আমার সম্পর্কে কিছু একটা জিজ্ঞেস করে সম্পাদকদের রুমে চলে গেলেন। পরে তার পরিচয় জানলাম তিনি ওই ব্যাংকের পরিচালক। ছাত্র রাজনীতি করতেন। উনি চলে যাওয়ার পর সম্পাদক আর ডাকলেন না। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম পরদিন আমার রিপোর্টটা বের হবে। ব্যাংকের অনিয়মের রিপোর্ট করছি ব্যাংক পাড়ায় সাড়া পড়ে যাবে নিশ্চয়। অনেক ভালো একটা রিপোর্ট করেছি। আত্মতৃপ্তি আছে।
সকাল বেলা পত্রিকা দেখে হতাশ হলাম। কোথাও রিপোর্টটি খুঁজে পাওয়া গেলো না। পাওয়া গেলো ওই ব্যাংকের বিশাল এক বিজ্ঞাপন। কমচে কম তিন লাখ টাকার বিজ্ঞাপন। ছোট রিপোর্টার আমি । কাউকে কিছু বলতেও পারলাম না। মনের মধ্যে একটা দুঃখবোধ নিয়ে অফিসে বসে রইলাম।
কিছু দিনেই মধ্যেই আরেক ঘটনা। সেটা একটা কো-অপারেটিভ নিয়ে। একই কেস। রিপোর্টের পরিবর্তে মাসজুড়ে পত্রিকায় ছাপা হচ্ছিল প্যানেল বিজ্ঞাপন। তখন একটু সাহস হয়েছিল। সম্পাদককে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি আমাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন নানা প্রসঙ্গ ও অনিয়মের অভিযোগ এনে। আত্ম সম্মানবোধে লাগার কারণে চাকরি ছেড়েছিলাম। নোটিশের জবাব দিয়েছিলাম তিন পৃষ্টা চিঠিতে। এভাবে ধীরে ধীরে আমি বিজ্ঞাপনের এই শক্তির কথা জানতে পারি।

সাধারণ মানুষের বা পাঠকের এখানে সেই একই অভিযোগ। এটাকে কোটি টাকার বিজ্ঞাপনের জোর ও ক্ষমতা হিসেবেই মানুষ উল্লেখ করছে। মানুষ আরো বলছে, ওই শিল্প গ্রুপের আরেক পরিচালকের বিরুদ্ধে এক সময় একটা হত্যা মামলা হয়েছিল সেটাও ‘ডিসমিস’ হয়ে গেছে


সম্প্রতি গুলশানে একটি মেয়ের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে দেশ ব্যাপী তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সোস্যাল মিডিয়ায় মানুষের নানা কথা উঠে আসছে। কোনো ঘটনা ঘটলে যা হয় আরকি। মিডিয়া ও মিডিয়ার মানুষের প্রতি মানুষের যে কি ধরনের ক্ষোভ তার বহি:প্রকাশ ঘটেছে গত দুদিনে। বিশেষ করে এই ঘটনায় অভিযুক্ত করে যার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তার নামটি বেশির ভাগ মিডিয়া নাকি মুখে নেয় আনেনি। মূল ধারার অনেক মিডিয়া কৌশলে নিউজটি প্রচার করেছে। তার ওই শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধিন পত্রিকা বা মিডিয়াগুলো নিউজটি ‘ব্ল্যাক আউট’ করেছে।

সাধারণ মানুষের বা পাঠকের এখানে সেই একই অভিযোগ। এটাকে কোটি টাকার বিজ্ঞাপনের জোর ও ক্ষমতা হিসেবেই মানুষ উল্লেখ করছে। মানুষ আরো বলছে, ওই শিল্প গ্রুপের আরেক পরিচালকের বিরুদ্ধে এক সময় একটা হত্যা মামলা হয়েছিল সেটাও ‘ডিসমিস’ হয়ে গেছে। কিভাবে হয়েছে, কেন হলো তা নিয়েও মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষ বিস্তারিত জানতে পারেনি। এ নিয়েও মানুষের ভেতরে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে মনে হয়।
এই যে বিজ্ঞাপনের কাছে মিডিয়ার নতজানু মনোভাব এটা কি একদিনে তৈরি হেেয়ছে? না একদিনে তৈরি হয়নি। আজকে একজন সম্পাদক হলেই তাকে দামি গাড়িতে চড়তে হয়, পাঁচ তারকা হোটেলে মন্ত্রী-মিনিস্টারের সাথে আড্ডা দিতে হয়। হাই সোসাইটি মেইনটেইন করতে হয়। যে জীবন মানুষের জন্য অকাতরে বিলিয়ে দেবেন বলে সাংবাদিকতার মতো মহান পেশায় তিনি যুক্ত হয়েছিলেন। তা থেকে যোজন-যোজন দুরে তিনি অবস্থান নেন। তিনি ক্ষমতা আর দাম্ভিকতায় নিজেকে বিরাট ক্ষমতাভাবন ভাবতে শুরু করেন। আবার উচ্চাভিলাষী জীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় গ্রহণ করেন নানা ছলচাতুরি। তাই তো সম্পাদক সাহেব বিজ্ঞাপনের কাছে নতজানু হয়ে জান। যে মিডিয়ার কল্যানে তার ক্ষমতা-প্রতিপত্তি সেটাকে টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হলে উঠেন। রাজনীতির উত্থান-পতনের সাথেও তিনি জড়িয়ে পড়েন। মুখে নিরপেক্ষতা বুলি আওড়ালেও তিনি কোনো না কোনো দলের ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের লেজুড় হয়ে কাজ করেন। আর যে শিল্পগ্রুপের মালিকানায় তার কাগজ তাদের খুশি করতে রাততে দিন আর দিনকে রাত করতে দ্বিধা করেন না। আর বর্তমানে যারা সংবাদপত্র বা মিডিয়ার মালিকানায় আসছে তাদের পরিচয় যদি আপনি নেন তাহলে দেখবেন কেন তারা অলাভজনক জেনেও মিডিয়ার পেছনে কাড়িকাড়ি টাকা ঢালছেন। তারা কালো টাকার মালিক নি:সন্দেহে। বাজারে ভূমিদস্যু, আইনের তোয়াক্কা না করা শিল্পগ্রুপ হিসেবে তাদের নাম মানুষের মুখে মুখে। অভিযোগ একেবারে মিথ্যে নয়। তো সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধিন কোনো মিডিয়ার সম্পাদক নিশ্চয়ই সাংবাদিকতাকে মহান করে তুলবেন না। তিনি একটা ভালো বেতনে চাকরি করবেন। গাড়ি চড়বেন। দামি ফ্ল্যাটে থাকবেন। আর এই জীবনধারা টিনিকে রাখতে মালিকের তোষামোদি করবেন। এটাই স্বাভাবিক।
এ কারণে মালিকের জন্মদিনে সম্পাদকের স্ট্যাটাস নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে। বিশেষন নিয়ে হাসির রোল পড়ে যায়। মালিকের নাকি মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত কলিজা। হিমালয়ের সমান হৃদয়। এর চেয়ে হাস্যকর আর কি হতে পারে।
পণ্যের প্রচার ও প্রসারের জন্য আগে প্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞাপন দিতো। কিন্তু আজ? একজন সাংবাদিক হিসেবে বলতে পারি বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান অন্যায় ঢাকার জন্য বিজ্ঞাপন দেয়। ২০১১ সালে একটি বাংলা বিজনেস ডেইলী প্রকাশ হওয়া শুরু হয়। প্রথম এক বছর ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজারকে কাঁপিয়ে দিয়েছে পত্রিকাটি। যে ব্যাংকের অনিয়মের রিপোর্ট দিয়ে তাদের যাত্রা শুরু সেই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিরাট প্রমোশনাল স্টোরি ছেপেছে এবার। কারণ পত্রিকাটিতে আগে নিউজের ফাঁকে বিজ্ঞাপন থাকতো এখন বিজ্ঞাপণের ফাঁকে নিউজ থাকে। কোনো প্রতিষ্ঠানকে এখন তারা সহজে ঘাটায় না। মাঝে-মধ্যে দু’ একটা স্টোরি দেখতে পাওয়া যায় অবশ্য। সেটা সেই সব প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নিয়ে যারা বিজ্ঞাপন দেয়নি বা দফারফা শেষশেষ হয়নি।
এভাবেই চলছে মিডিয়া। মিডিয়া চালানোর যে বিরাট ব্যয় সেটা উসুল করতে সম্পাদক, মালিক আত্মা সম্মান আর নিজেদের বিকিয়ে দিয়ে সাংবাদিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এ কারণে অভিযুক্ত ছবি ঝাপসা করে দিয়ে ‘ভিকটিম’এর হাস্যজ্জ্বোল ছবি দেখাতে আমাদের মিডিয়াগুলোর লজ্জা করে না। থানায় মামলা হওয়ার পরেও অভিযুক্তের নাম ভাসুরের মতো মুখে আনতে চান না তারা। কারণ উপর নিচ দিয়ে অনেক পয়সা তারা নেন।
এই যে বিজ্ঞাপণের অনুশাসন, শক্তি ও ক্ষমতা এ থেকে মিডিয়াগুলো বের হতে পারবে না। কারণ প্রয়োজনের তুলনায় মিডিয়া এখন অনেক বেশি। তার চেয়ে বেশি সম্পাদক ও তার উচ্চাভিলাষী জীবনের লোভ। কালো টাকার মালিক এখন মিডিয়ার কর্ণধার। এটাকে তিনি সমাজ বা রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য ব্যবহার করছেন না। তিনি এটাকে ঢাল আর আরেক্িট করপোরেট বিজনেস হিসেবে দেখছেন। এ কারণেই মিডিয়ার মান এতো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এতো নিচ নেমে গেছে।
এটা গেলো বেসরকারি বিজ্ঞাপনের পরিস্থিতি। সরকারি বিজ্ঞাপনের চিত্র আরো ভয়াবহ। সেটা আরেক লেখায় উল্লেখ করা যাবে।
এটা বলেই শুধু লেখাটা শেষ করতে চাই সেটা হলো, মামলা হওয়ার পরেও অনেক মিডিয়া প্রথম দিন বসুন্ধরা গ্রুপের এমডির নাম আনতে পারেনি। তারা বলেছে, একটি শিল্পগ্রুপের এমডি। তাহলে বোঝা যাচ্ছে এদেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার কি? এসব প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী সম্পাদকরা জাতিকে মধ্যরাতে নসিহত করেন নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে ও ক্ষমতার হাত লম্বা করতে।
লেখক : সম্পাদক, অপরূপ বাংলা।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top