গ্রামের শহরায়নের আসল পথ | মতামত | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | বৃহঃস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮
মতামত

গ্রামের শহরায়নের আসল পথ

তায়েব মিল্লাত হোসেন

প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২১ ০৮:৩৮ আপডেট: ১৩ জুন ২০২১ ০৮:৩৯

তায়েব মিল্লাত হোসেন | প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২১ ০৮:৩৮


অলংকরণ : রাজিব হাসান

চাচা, ঢাকা কতো দূর?

এই জিজ্ঞাসায় লাল নীল বাতির শহর দেখার আকুতি আছে। আছে রাজধানীতে আসার আজন্ম কৌতুহল মেটানোর তাগিদ। কিন্তু যাদের এই প্রশ্ন তাদের সবাই শুধু ঢাকা দেখতেই আসে না। বরং অনেকেই আসে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের তালাশে। আর ঢাকা শহর এমনি উদার যে কিছু একটা মিলেও যায়। কোনো উপায় না পেলে অন্তত শহরের ফুটপাত অনায়াসেই ঠাঁই দেয় নবাগতদের। তাই তো ঢাকামুখী যে জনস্রোত তার কোনো বিরাম-বিরতি নেই। যার জেরে কোটির পর আরেক কোটিতে পৌঁছে যাচ্ছে নগরের নিবাসী সংখ্যা। বেড়েই চলেছে জনজট। রাস্তার যানজটেও সেই প্রতিফলন। গ্যাসে, বিদ্যুতে, পানিতেও চাহিদা ও যোগানের অনুপাত উর্ধ্বমুখী সূচকে থাকছেই। এ অবস্থায় উপসংহারে আসা সহজ যে, অপরিকল্পিত ঢাকা পরিকল্পিত হয়ে গেলেও সংকট কাটবে না। যদি নগর পরিকল্পনায় না থাকে জনস্রোত থামানোর কোনো উদ্যোগ।

আপাতত কিন্তু ঢাকায় আসার প্রবণতা কমছে না। সরকারি হিসেবেই প্রতিদিন অন্তত ১৭০০ মানুষ যুক্ত হচ্ছে নগরে। এ হিসেবে বছরে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ছয় লাখেরও বেশি। এতো এতো মানুষ কেন আসে ঢাকায়? শুরুতেই বলা হয়েছে, কাজের সন্ধানের কথা। তরুণরা আসে পড়াশোনার জন্য। কেউ কেউ আসে চিকিৎসা নিতে। আবার আসে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বহারা মানুষও। যাদের বড় একটি অংশ নদী ভাঙনের শিকার। ঘুরেফিরে অবশ্য আসবে কর্মংস্থানের বিষয়টিই।

শুধু রুটি-রুজির তাগিদেই যে লাখ লাখ মানুষ ঢাকায় পড়ে থাকতে বাধ্য হয়, তা ঈদের আগে তাদের ঘরে ফেরার তাড়না দেখে সহজেই কিন্তু আঁচ করা যায়। গ্রামগঞ্জে যদি কিছু একটা করে খেতে পারতো, তবে তারা ইটপাথরের শহরে পড়ে থাকতো না। আধা পাকা ঘরের দমবন্ধ গরমে কে আর দিনাতিপাত করতে চায়! শুধু নিজের আর পরিবারের মুখের গ্রাস জোগাড়েই তো এই আপোষের জীবন।

এসব কিন্তু নতুন কথা নয়। অজানাও নয় সরকারের কাছে। এই মেয়াদে সরকারে আসার আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে তাই যুক্ত হয়েছিলো 'গ্রাম হবে শহর' - এমনি এক প্রতিপাদ্য। তা বাস্তবায়নের দিকেও যাচ্ছে রাষ্ট্র। যে উদ্যোগের কাগুজে নাম হচ্ছে 'আমার গ্রাম আমার শহর'। এর আওতায় শহরের সব নাগরিক সেবা গ্রামেও নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে। বিদ্যুতের বিষয়ে অগ্রগতি আছে আগে থেকেই। এলপিজি মারফত গ্যাসের চুলায় রান্নাবান্নাও গ্রামের বাড়িতে আর নতুন বিষয় নয়। বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিতেও তিন-চার দশকে যথেষ্ট অগ্রগতি আছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গভীর নলকূপ মিলছে। অনেক অনেক রাস্তা তৈরি হচ্ছে। পিচঢালা পথ শুধু রাজধানী নয় গ্রামের বুকের ওপর দিয়েও চলে যাচ্ছে। মানুষের জন্য এগুলো কিন্তু এখন মৌলিক চাহিদা হিসেবেই গণ্য। গ্রাম এর বেশি নগর হতে গেলেই কিন্তু ভজঘট লেগে যাবে। যদি অবাধে আবাদি জমিতে ভবন গড়া হয়। যদি যন্ত্রযানের দাপটে গ্রাম থেকে হারিয়ে যায় পাখির ডাক। পানি,বায়ু,শব্দ,দৃশ্য- চারিদিকেই দূষণ; এরকমের 'গ্রাম হবে শহর' কী আমরা চাই? নিশ্চয়ই না।

আসলে নগরের উন্নয়ন আর পল্লীর উন্নয়ন গুলিয়ে ফেললে হবে না। আমাদের দেশে একটির সঙ্গে অবশ্যই অন্যটি জড়িত। তবু দুটো বিষয় নিয়ে সমন্বিত, কিন্তু দুই ধারার পরিকল্পনা করতে হবে। গ্রামকে গ্রামের আদলে রেখে পরিকল্পনা করতে হবে। যেখানে প্রাধান্য পাবে কৃষি। চাষাবাদে উৎপাদন বাড়াতে, খরচ কমাতে প্রযুক্তির বিস্তার করতে হবে। আমাদের চাষীরা, আমাদের খামারিরা যাতে পণ্যের ন্যায্য দাম পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ হালে বাম্পার ফলনের খবর যেমন থাকে, তেমনি কৃষক লোকসানের মুখে এমন প্রতিবেদনও থাকে। এই ক্ষতি পূরণে কিংবা পরের বছর আবাদের খরচের টাকা জমাতে ঢাকায় এসে রিকশা চালায় কিংবা মজুর দেয়- এমন মানুষ অনেকই মেলে রাজধানী শহরে। কৃষি লাভজনক হলে কৃষক হয়ে, কৃষিশ্রমিক হয়ে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান গ্রামেই নিশ্চিত করা সম্ভবপর। কিন্তু কৃষিতে লোকসানের ধারা যদি চলতে থাকে, তবে তাদের গ্রামে ধরে রাখা যাবে না। সেটা যাচ্ছেও না।

কর্মসংস্থানের বড় একটি পথ হলো গিয়ে শিল্পায়ন। এতে আবার পরিবেশের জন্য ঝুঁকি থাকে। হুমকির মুখে পড়তে পারে কৃষি জমি। অনেক ক্ষেত্রে পড়ছেও। এসব এড়াতে হলে পল্লীর শিল্প হতে হবে কৃষিভিত্তিক। এতে কৃষকও বাঁচবে। হবে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের পথও। এভাবে গ্রামীণ দারিদ্র মোচন সম্ভব হলে, জীবিকা নিশ্চিত করা গেলে; লাখ লাখ মানুষ শহর থেকে গ্রামে ফিরে যাবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

 

শুধু রুটি-রুজির তাগিদেই যে লাখ লাখ মানুষ ঢাকায় পড়ে থাকতে বাধ্য হয়, তা ঈদের আগে তাদের ঘরে ফেরার তাড়না দেখে সহজেই কিন্তু আঁচ করা যায়। গ্রামগঞ্জে যদি কিছু একটা করে খেতে পারতো, তবে তারা ইটপাথরের শহরে পড়ে থাকতো না। আধা পাকা ঘরের দমবন্ধ গরমে কে আর দিনাতিপাত করতে চায়! শুধু নিজের আর পরিবারের মুখের গ্রাস জোগাড়েই তো এই আপোষের জীবন

 

গ্রাম হবে শহর- এর বড় এক অর্থ করা প্রয়োজন পল্লী অঞ্চলে শিক্ষার মানোন্নয়ন। বিভিন্ন পর্যায়ের মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে। গ্রামে লেখাপড়ার ভালো ব্যবস্থা নেই- এই কারণ দেখিয়ে শহর বাস করে এমন পরিবারও মিলবে যথেষ্টই। গ্রামে পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত হলে তারা সহজেই ফিরে যাবে শেকড়ের কাছে।

এখন যেমন শহর মানেই সহজে রোজগার, ভালো থাকা, ভালো খাওয়া, ভালো চিকিৎসা। গ্রামের চিত্র কিন্তু উল্টো। চিকিৎসার বেলায় তো শতভাগ সত্য। তাই আমাদের দেশের ইউনিয়নে-উপজেলায়-জেলায় মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিতে অনেক অনেক উদ্যোগ প্রয়োজন। করোনাময় সময় এসে সেই দাবি আরো জোরদার করেছে। তাই গ্রামে হবে শহরের মতো চিকিৎসাব্যবস্থা- এটা কার্যকরের বিকল্প কোনো পথ আর নেই।

আমাদের দেশের পল্লী এলাকার শত-হাজার বছরের সমস্যা নদীভাঙন। বছর বছর বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়ও পথে নামায় অনেককে। এ জাতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বস্বান্ত পরিবারগুলোকে দ্রুততর সময়ে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলেই কীভাবে পুনর্বাসন করা যায়, তার জন্যে কার্যকর পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।

সোজাকথায় বললে, গ্রামকে শহর করা- এই ধারার নগরায়ন হলে চলবে না। পল্লী উন্নয়নের জন্য আলাদা পরিকল্পনায় কাজ করতে হবে। যেখানে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার রকমারি অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। উদ্যোগী হতে হবে দুর্যোগ প্রশমনে। প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য পুনর্বাসন করতে হবে আক্রান্তদের। এসব হলে আমাদের অদম্য পল্লী-জনতার অগ্রগতি কেউ রুখতে পারবে না।

তাই গ্রাম শহর হয় হোক। কিন্তু কৃষকের মুখে আর মাঠে মাঠে থাকুক ফসলের হাসি। থাকুক বা আসুক গোয়াল ভরা গরু, ঘোলা ভর ধান আর পুকুর ভরা মাছের দিন। রাতের গ্রামও আলোকিত হোক বিদ্যুতে, রান্নাঘরে জ্বলুক এলপিজির চুলা। পাকা সড়ক ধরে চলুক যানবাহন। কিন্তু শহরের ইট-পাথরের জঙ্গল, জলাবদ্ধতার মতো নেতিবাচক নানা দিক গ্রামে দেখতে চাই না।

আমি চাই, এমন জাতীয় বাজেট, যাতে করে গ্রাম হবে কর্মমুখর। সেই তো আমাদের প্রকৃত ধারার গ্রামের শহরায়ন। যেখানে ঢাকার নগরায়নও কৃতজ্ঞ হবে গ্রামের কাছে, যারা ফিরে যাবে গ্রামে তাদের কাছেও। সেই ফেরা কভিডের কর্মহীনতায় পরিবার নিয়ে শহর থেকে গ্রামের দিকে অনিশ্চিত যাত্রা হবে না- সেটা নিশ্চিতের কৃর্মযজ্ঞ হোক না শুরু। আমাদের প্রজাতন্ত্রের মাননীয় সরকার মহাশয়, এ বিষয়ে বিনীত নিবেদন থাকলো আপনার বরাবর।

তায়েব মিল্লাত হোসেন: সাংবাদিক ও গবেষক




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top