মানুষ কি চিরযৌবন পাচ্ছেন! | মতামত | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮
মতামত
সায়েদুল আরেফিন

মানুষ কি চিরযৌবন পাচ্ছেন!

অপরূপ বাংলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৬ জানুয়ারী ২০২১ ১১:৪৭ আপডেট: ৬ জানুয়ারী ২০২১ ১৪:৩৩

অপরূপ বাংলা প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ৬ জানুয়ারী ২০২১ ১১:৪৭


সায়েদুল আরেফিন

গত মাসে মানে অক্টোবর ২০২০ এ দুটি খবরে অনেকেই চমকে গেছেন, আবার অনেকে আশার আলো দেখে মিটি মিটি হাসছেন। অনেকে ইদানীং জিনম সিকোয়েন্সিং এর কথা শুনেছেন। তবে জিন সম্পাদনা বা এডিটিং এর কথা শুনেছেন কি! জি, এমাসের গড়ার দিকে জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে ডিএনএ সম্পাদনার সূক্ষ্মতম কৌশল উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসাবে রসায়নে নোবেল পেয়েছেন দু'জন নারী গবেষক। এদের একজন হলেন, ফ্রান্সের এমানুয়েল শাপেনটিয়ে এবং অন্যজন যুক্তরাষ্ট্রের জেনিফার ডুডনা। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের সবচেয়ে বড় শহর আহমেদাবাদের সাহদেভসিন সোলাঙ্কি। তার প্রথম সন্তান মেয়ের পরে ছেলে হয়, যার নাম রাখা হয় অভিজিৎ। অভিজিৎ থ্যালাসেমিয়ায় ভুগছিল। অবস্থা এমন হয় যে, তার বয়স ছয় বছরে পৌঁছানোর আগেই তাকে ৮০ বার রক্ত দিতে হয়।
এর পরে ডাক্তারের পরামর্শে সাহদেভসিন সোলাঙ্কি শিশু মাতৃ গর্ভে থাকার সময়েই জিন সম্পাদনা বা এডিটিং করিয়ে কাভ্যিয়া সোলাঙ্কি নামে একটি মেয়ে শিশুর বাবা হন ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে। গত মার্চ মাসে, তার বয়স যখন দেড় বছর, কাভ্যিয়া সোলাঙ্কির দেহ থেকে অস্থিমজ্জা সংগ্রহ করে সেটা তার সাত বছর বয়সী বড় ভাই অভিজিৎ-এর দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়। থ্যালাসেমিয়া হলে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ত্রুটি দেখা দেয় যার ফলে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বিপজ্জনকভাবে হ্রাস পায়। অভিজিৎ এর দেহে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের পর এখন কাভ্যিয়া সোলাঙ্কি ও অভিজিৎ দুজনেই ভাল আছে।
এবার একটু পিছনে ফিরে দেখা যাক। ১৯৭০ সালে রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে জীববিজ্ঞানে নতুন যুগের সূচনা হয়। বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মত ডিএনএতে পরিবর্তন নিয়ে আসার সুযোগ পান। যার ফলে একক কিংবা একগুচ্ছ জিন নিয়ে কাজ করে কিছু অভিনব ওষুধ এবং জৈবপ্রযুক্তি তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ের জিনোম এডিটিং প্রযুক্তি জীববিজ্ঞানের আরেকটি বিপ্লবের সূচনা করেছে। কিন্তু এখন একদম কোষের ভেতরে থেকেই জিনোমের মধ্যেই জিনের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। পরিবর্তন বলতে নতুন জিন যুক্ত করা, কোন জিনকে বাদ দেয়া কিংবা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব।
জিন সম্পর্কে জানতে বা শনাক্ত করার জন্য প্রথমে তার জিনোম সিকোয়েন্সিং করতে হয়। জিনোম সিকোয়েন্সিং করার অর্থ হলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিএনএ অণুর ভেতর বেইসগুলো কিভাবে আছে তা বের করা। বর্তমানে আধুনিক মেশিনের সাহায্যে দ্রুত সেটা করা হয়। এটা করে জীব বা প্রাণীর ভেতরের জীবন নকশা বের করা হয়। ফলে এরপর বিজ্ঞানীরা সেই জিনোমে বা ডিএনএ-তে পরিবর্তন এনে ক্ষতিকর উপাদান বা ঝুঁকি হ্রাস করার চেষ্টা করতে পারেন।
নোবেল জয়ী বিজ্ঞানীরা জিন সম্পাদনা বা এডিটিং এর যে পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, সেটি হলো ক্রিসপার-ক্যাস নাইন পদ্ধতি। এটি নিখুঁতভাবে জিনোম সম্পাদনার কাজটি সম্ভব করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিনের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীদের জন্য কোন জীব বা প্রাণীর ডিএনএ পরিবর্তন, কোন অংশ বাদ দেয়া, নতুন অংশ সংযোজন করা অথবা জিনোমের নির্দিষ্ট অংশ পরিবর্তন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটা দ্রুত, কম খরচের, অনেক বেশি নির্ভুল এবং জিনোম সম্পাদনার অন্যান্য প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি দক্ষ।
জিন সম্পাদনা বা এডিটিং করে ২০১৬ সালে বিশ্বে প্রথমবারের মতো 'স্পটি ভেড়া' জন্ম দিয়েছেন চীনের বিজ্ঞানীরা, যার শরীর পশম অনেকটা গরু ও স্পটি কুকুরের মতো। এখানে আণবিক কাঁচি ব্যবহার করে এক প্রাণীর ডিএনএ কেটে অন্য প্রাণীতে যুক্ত করা হয়েছিল। তবে এই পদ্ধতির গবেষণা নিয়ে বিতর্ক আছে এই কারণে যে, অনেকের আশঙ্কা, এর ফলে বাবা-মা নিজেদের ইচ্ছামত বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে সন্তান জন্ম দিতে চাইতে পারেন। ফলে স্বাভাবিকতা ব্যাহত হবে। এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে যে, জিনোম সম্পাদনা করে মানুষের উচ্চতা বা বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়গুলো যদি নির্ধারণ করে দেয়া হয়, সেটা নৈতিকভাবে ঠিক হবে কিনা।
মনে করুন আপনি এবং আপনার স্ত্রী একটি বাচ্চা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আপনি একটি জেনেটিক ডিজাইনারকে কল করে ব্যক্তিগত অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য বলেন। তারপরে আপনি রান্নাঘরের টেবিলে বসে আপনার শিশুটির চেহারা কেমন হওয়া উচিত এবং তার কি বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে সে সম্পর্কে কথা বলতে শুরু করুন। আপনি সিদ্ধান্ত নেবেন যে আপনি প্রচুর স্বর্ণকেশী চুলের সাথে একটি সুন্দর এবং স্বাস্থ্যকর ছেলে রাখতে চান। তার খুব বুদ্ধিমান হওয়া উচিত, তার চোখের দৃষ্টিশক্তি হওয়া উচিত, এবং তার একটি দুর্দান্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকা উচিত, পেশী শক্ত হওয়া উচিত, লম্বা হওয়া উচিত এবং একটি সুন্দর হাসিমাখা মুখ থাকতে হবে। গায়ের রংটা হবে শ্যামলা বা পছন্দের কোন রঙ। যদি সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রিত সমাজে বায়োটেকনোলজির অগ্রগতির সাথে সাথে একজন নেতা মানুষের জৈবিক "বর্ণ" সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেন - নীল-কলার শ্রমিক হিসাবে কাজ করে এমন মানুষ উৎপাদন করছেন, সাদা-কলার শ্রমজীবী বা হত্যাযন্ত্রের উৎপাদন করছেন এমন মানুষ উৎপাদন করে - জেনেটিক্যালি সংশোধিত সৈন্যরা সহানুভূতি বা অবাধ ইচ্ছার অক্ষমতা সহ, তাহলে কেমন হবে!
চীনা গবেষকরা এপ্রিল ২০১৫ সালে সিআইআরএসপিআর(পষঁংঃবৎবফ ৎবমঁষধৎষু রহঃবৎংঢ়ধপবফ ংযড়ৎঃ ঢ়ধষরহফৎড়সরপ ৎবঢ়বধঃং) পদ্ধতি ব্যবহার করে মানব ভ্রূণের জিনোম সম্পাদনা করার জন্য রিপোর্ট করেছেন, তবে তারা কীভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে বা করা উচিত তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্ক তৈরি করেছিল।
ভ্রূণের জিন-সম্পাদনা বিশাল ঝুঁকি বহন করে যেহেতু সিআরআইএসপিআর ঘটনাক্রমে এমন জিনগুলি সম্পাদন করতে পারে যার ডিএনএ সিকোয়েন্স রয়েছে তার টার্গেটের অনুরূপ, এবং ভ্রূণগুলিতে অপরিবর্তনীয় মিউটেশন ঘটায়। এটি একটি ভীতিজনক এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক ফলাফল এবং এ জাতীয় পরিস্থিতি এড়াতে আমাদের অবশ্যই সমস্ত কিছু করা উচিত।
কি ঘটবে, যদি আমরা রোগ নির্মূল করতে এবং পুরোপুরি সুস্থ মানুষের ডিজাইন করতে সক্ষম হই? আমরা যদি বার্ধক্যের জন্য দায়ী জিনটিকেও খুঁজে পায় এবং আমরা সিআরআইএসপিআর এর সাহায্যে এটি কেটে ফেলতে সক্ষম হব? আমরা কি দুই বা তিনশো বছর বাঁচবো এবং আমাদের ২২ বছর বয়সের নিজের মতো, চিরযৌবনা থেকেই মরে যাব?
কীভাবে আমরা এমন একটি পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারি? আমরা কি সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ইতিমধ্যে এটি কল্পনাযোগ্য সম্ভাবনার সাথেও মোকাবিলা করতে পারি? এটি আমাদের প্রজাতি, প্রকৃতির সাথে আমাদের সম্পর্ক - এমনকি জীবন এবং মৃত্যু সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দেবে। এবং যদি কিছু ভুল হয়? এ জাতীয় দৃশ্যের পরিণতি কি? আমরা যদি মশার ম্যালেরিয়া জিনগুলি কেটে ফেলি, তবে আমরা যদি দুর্ঘটনাক্রমে তাদের হত্যা করি? বাদুড়রা তখন কি খাবে? আর যদি বড় কিছু হয়? আমরা যদি মানবতাকে মৃত্যুর নিন্দা করি?
আমরা কি আমাদের ছোট্ট মহাবিশ্বে সমাহিত এই জাতীয় বিষয়গুলি সম্পর্কে ভাবতে পারি?
পাঁচ শ' বা হাজার বছর পরে জিন এডিটিং করে করে এমন মানুষ বানান হল যে, গটা দুনিয়ায় শুধু ভাল মানুষ, খারাপ কোন মানুষ আর নেই। এটা হয়ত আর কল্পনা নয়, বাস্তব হতে চলেছে।
তথ্যসুত্রঃ বিবিসি, নেচার, ইত্যাদি

 




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top