আবার পেয়েছি তাঁকে নতুন করে | মতামত | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮
মতামত
আবেদ খান

আবার পেয়েছি তাঁকে নতুন করে

অপরূপ বাংলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারী ২০২১ ১০:২৩ আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০২:৫৮

অপরূপ বাংলা প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ১২ জানুয়ারী ২০২১ ১০:২৩


ফাইল ফটো

কয়েকটি আশা জাগানিয়া সংবাদ আমার দীর্ঘ বিষন্নতাকে অনেকখানি অপসারিত করেছে। সব সংবাদই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়ক। প্রথম সংবাদের সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে কিছুদিন আগে আওয়ামী লীগের একটি নির্বাহী কমিটি সভার আলোচ্যসূচিতে একটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। আলোচ্য বিষয়টি ছিলো ২৮ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর জন্মদিন পালন প্রসঙ্গে। এ বিষয়টি প্রস্তাবিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জননেত্রী বলেছেন, “কেন এটা দলের আলোচ্যসূচির মধ্যে থাকবে। আওয়ামী লীগ কেন আমার জম্মদিন পালন করবে? আমি অনেকবার নিষেধ করেছি এটা করতে। কিন্তু কেন সেটা শোনা হচ্ছে না।” তাঁর এই ভৎর্সনার পর সবাই চুপসে গিয়েছিলেন। প্রসঙ্গটি তখন আর উত্থাপিত হয়নি।

দ্বিতীয় বিষয়টি অতিসাম্প্রতিক এবং আলোড়ন সৃষ্টিকারী। তিনি স্পস্ট হুঁশিয়ারী দিয়ে বলেছেন, “দেশেকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে ঘর থেকে শুরু করতে হবে।” এরপরই দেখা গেলো সংগঠনের বিভিন্ন স্তর থেকে দুর্নীতির আগাছা উৎপাটন শুরু হলো। দলের অনেকে উদ্বিগ্ন হলেন, কিন্তু অভিযান ব্যাপকভাবে জনগনে আস্থা অর্জন করলো। ক্লেদ মুক্ত রাজনীতির অবয়বটি ক্রমশ দৃশ্যমান হতে থাকলো। সবচাইতে আলোড়িত হবার ব্যাপার হচ্ছে মুজিববর্ষ নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সাম্পতিক অবস্থান। তার কঠোর নির্দেশ হচ্ছে মুজিববর্ষ নিয়ে বাড়াবাড়ি চলবে না। সর্বাগ্রে দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ এবং তারপর উৎসব। অতি উৎসাহিদেও মহোৎসবের বেলুন চুপশে গেছে এর ফলে। আশ^স্ত বোধ করছেন বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত অনুশারিরা।

এই সব সংবাদই আমার দীর্ঘ বিষন্ন নীরবতা অপসৃত হওয়ার কারণ হিসেবে পাঠক নি:সন্দেহে ধরে নিতে পারেন। অবশ্য কারও কারও মনে হতে পারে আমি বোধহয় এই ছুতোয় হাসিনা বন্দনা করে নিলাম। সুপ্রিয় পাঠক, তেমন বাসনা আমার নেই এবং কখনো ছিলোও না। আমি নিজের মতো করে কাজ করি ও কাজ করে চলেছি এবং আমার বিশ্বাসের সঙ্গে আমি কখনো প্রতারণা করিনি। পঞ্চাশের দশকের মধ্যে ভাগ থেকে বঙ্গবন্ধুর নি:স্বার্থ উপাসক থেকেছি এবং এই পড়ন্ত কালেও সেখান থেকে বিচ্যুতি ঘটেনি। আমি আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলাম না কখনো এবং আওয়ামী লীগের অনেক চিন্তার সঙ্গে সব সময় যে একমত হয়েছি তাও নয়। যখন সমালোচনা করার তখন সমালোচনা করেছি গঠনমূলকভাবে, সে সব পদক্ষেপের দুর্বল অংশ চিহ্নিত করে তুলে ধরেছি। কখনো নিজেই নিজের ভবনা সংশোধন করেছি, আবার দেখেছি কোনও কোনওটা আওয়ামী লীগও রাজনৈতিকভাবে সংশোধন করে নিয়েছে। তবে আমার পঞ্চাশের দশকের ‘লিডার’, ষাটের দশকের ‘মুজিব ভাই’, ষাটের শেষাংশে ‘নেতা ও বঙ্গবন্ধু’, এবং সত্তর দশকের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার প্রগাঢ় শ্রদ্ধার অণুমাত্র ব্যত্যয় ঘটেনি, কিংবা তার নিকটতম পরিবারের সদস্যদের প্রতি আমার  স্নেহ বা শ্রদ্ধার এতটুকু অন্যথা হয়নি।

আমি আমার পেশাগত জীবনে বঙ্গবন্ধুর পথ ও পরিক্রমণ কখনো কাছ থেকে, আবার কখনো দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেছি। কিভাবে তিনি দলনায়ক থেকে জননায়ক, জননায়ক থেকে দেশনায়ক, দেশনায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক এবং রাষ্ট্রনায়ক থেকে কালোত্তীর্ণ বিশ্ব নায়কে পরিনত হয়েছেন সেটাও দেখার চেষ্ট করেছি গভীরভাবে। দেখেছি কিভাবে মানুষের ঢল নামে তাঁর যাত্রাপথে। দেখেছি তাঁর বার বার কারারুদ্ধ হওয়ার পর কিভাবে বাংলার মানুষ ক্ষেভে ফেটে পড়ে, দেখেছি তাঁর বিভিন্ন সময়ের সংবাদ ও চিত্রাবলী। আবার এই মহামনবকে দেখেছি গভীর মমতায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বরেন্য মনুষকে জয় করতে । আবার এই মানুষই বাঙালীর স্বাধীন সত্তার স্বার্থে সমরিক শাসকের ফাঁসির রজ্জুর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেছেন। দেশ ও জাতীকে তৈরী করেছেন স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিতে। দেখেছি সত্তরের ঘূর্নিঝড়ে, নির্বাচনে-দেখেছি একাত্তরের সাত মার্চে সর্বকালের সর্বযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইতিহাস তৈরী করতে - পঁচিশে মার্চের নারকীয় গণহত্যার মূহূর্তে নিজেকে নির্দ্ধিধায় অনিবার্য প্রাণদন্ডের হাতে সঁপে দিতে। দেখেছি বাহত্তরের দশ জানুয়ারী মহানায়কের আগমনের অভূতপূর্ব দৃশ্য।

আবার একই সঙ্গে দেখেছি ষড়যন্ত্রের বিচিত্র রূপ - চেনা মনুষের ক্রমশ: অচেনা হতে থাকার দৃশ্য। দেখেছি অপপ্যচারণার  স্রোত, শুনেছি প্রশস্তির কারাগারে বন্দী নায়কের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ, শুনেছি তার অসহায় আর্তনাদ-‘আমার চারদিকে শুধু চাটার দল’-দেখেছি কীভাবে ধীরে ধীরে তিনি মুখোশধারীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে চলেছেন, দেখেছি কীভাবে স্বাধীনতার দুশমনরা মহারাষ্ট্রীয় বিপর্যয় সংঘটনের জন্য জাল গোটাচ্ছে সেই দৃশ্যও।

তারপর তো বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির অন্ধকার যুগের সূচনা। স্বাধীনতার মর্মবানী পালটে দিয়ে পাকিস্তানের পূণর্বাসনের ক্লেদাক্ত প্রয়াস-পূতপবিত্র দেবচরিত্রকে দানব প্রমানের নির্লজ্জ আয়োজন-স্বাধীনতার শত্রুদের প্রেতনৃত্য-সে সবও দেখতে হলো আমার পেশাগত জীবনে। দেখেছি আমার সোনালী স্বপ্ন লুঠ হয়ে যাওয়ার বীভৎস মহোৎসব। দেখেছি মুখোশগুলো খসে পড়া কতিপয় কদাকার মুখায়বের উল্লাস।

তখন তো এ দেশ আমার ছিলো না। এই সবুজ বনাঞ্চল, এই নদীমেখলা জনপদ-এই বৃক্ষরাজি এই পক্ষীকূলের কলকাকলি কিছুই আমার ছিলো না, আমাদের ছিলো না, মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী পক্ষের ছিলো না। মসীলিপ্ত অন্ধকার রজনীরও তো অবসান ঘটে-ঘটলোও তাই। আবার উচ্চারিত হতে পারলো জনকের নাম। আবার জাগলো বাংলাদেশ-জাগলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আবার আমরা আত্মশক্তিকে শাণিত করে প্রস্তুত হলাম। শেখ হাসিনা দলয় রাজনীতিকে সাজালেন হারিয়ে যাওয়া চেতনায়। আমরা আবার জাগলাম, আবার একুশ, নববর্ষ লাল সবুজ পতাকা, মুক্তিযোদ্ধা, বঙ্গবন্ধু জেগে উঠতে থাকলো আমাদের চেতনায় কিন্তু এটাই তো শেষ নয়। ঈশান কোণে জমলো মেঘ। তাদের উম্মত্ত দাপাদাপিতে বিপন্ন মানবতা। সেটা ছিলো মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালের দ্বিতীয় রাক্ষুসী কাল। কিন্তু তাওতো দেখলাম এবং মুখোমুখি হলাম।

আবশেষে সেটাও গেলো। মনে হলো শেখ হাসিনার বদৌলতে বাংলাদেশ আবার দেশে ফিরলো। উন্নতি হচেছ-মানুষের ভাগ্য ফিরছে, ঘরে আলো জ¦লছে, হাড়িতে চাল ফুটছে, মাঠে ফসল ফলছে-কিন্তু একই সঙ্গে অতি সন্তর্পনে গজিয়েছে অনেক কাশিমবাজারের কুটি।
ফিরে ফিরে আসছে ষড়যন্ত্র সহস্র ফনা তুলে। পঁচাত্তরের মত এই শত্রুদেরও লক্ষ্যমুখতো একটাই। একটা মানুষ এবং একটা পরিবার। লক্ষ্য থাকে সুনির্দিষ্ট, ঠিক এইভাবে। যে লক্ষ্য ভেদ করলে বিদীর্ন করা যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক।

যত দিন যাচ্ছিল আমি ততই ধীরে ধীরে বিপন্ন এবং বিষন্ন হয়ে পড়েছিলাম। বাহত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত যেভাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের নেপথ্যে পদচারণার শ^াপদগতি দেখেছি এখন আবার যেন তারই পূর্বাভাস। সেই একই ধরনের কানে কানে ফিস ফিস-একই ধরণের স্তাবকতার স্তাবক। তবে তফাৎ তো আছেই। তখন প্রযুক্তির এতো আস্ফালন ছিলো না, প্রত্যক্ষ শত্রু ছিলো নির্দিষ্ট-মুখোশের সংখ্যাও ছিলো সীমিত। তখন অসর্তকতার কারণে ষড়যন্ত্রকারীদের গতিবিধি ছিল অবারিত। কিন্তু এখন মুখোশের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ, প্রযুক্তি হয়েছে বিপুলভাবে প্রসারিত। গুঞ্জন গুঞ্জরিত হওয়ার মাত্রাও বেড়েছে বহুগুণ। বিভ্রান্তি বিতরণকারীরা আঘাত হানার ব্রহ্মাস্ত্র নিয়ে সদা সক্রিয়। আমি বিষন্ন হয়ে পড়ছিলাম কারণ দেখছিলাম মিথ্যাচারের সহ¯্রবাণ বর্ষনে মানুষের বিশ^াস স্থাপনের ভিতটি জর্জরিত হচ্ছে, অর্জনের বাস্তব রূপটিকে আড়াল করছে অপপ্রচারের অন্ধকার নেকাব। ক্রমাগত বিষন্ন হচ্ছিলাম যখন দেখছিলাম মুক্তিযুদ্ধের সবচাইতে বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠনটিতে ছদ্মবেশীদের প্রাদুর্ভাব ঘটছে। দুর্নীতির বিশালকার দানবটি যখন স্ফীতদেহী হতে হতে দলের, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে রাষ্ট্রকাঠামোর কেন্দ্রে এসে আঘাত করছে। প্রচন্ড অসহায় বোধ করেছি। মুখোশধারীদের কথা যতবার যত জায়গায় বলতে গিয়েছি দেখেছি ততবার ভালভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়েছে। একাত্তরে শত্রুর মুখে পড়ে কিংবা পঁচাত্তরের পর নব্বই-এর পর, কিংবা দুই হাজার একের পরও এতোখানি বিপন্নবোধ করিনি কখনও। মনে হয়েছে মিথ্যা, স্বার্থবাদিতা আর ভোগবাদিতার পাশাপাশি লোভ ও স্বার্থপরতার অশ্লীল বিস্তারে আমার নি:শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে।

ঠিক এই সময় ঐ সময় কয়েকটি সংবাদ আমাকে নতুন প্রণোদনা দিয়েছে এবং বিশ^াস স্থাপনে নতুন শক্তি সঞ্চারিত করেছে। বঙ্গবন্ধুতনয়ার প্রতিক্রিয়ার এবং সক্রিয় পদক্ষেপের ভেতর দিয়ে আমি অন্তত এই বার্তা আতœস্থ করেছি যে তার চতুস্পাপাশ্বের অদৃশ্য প্রাচীর সুকৌশলে গড়ে তোলা হয়েছে সেটা বিচূর্ন করার জন্যই তিনি পা বাড়াচ্ছেন। এখন তোষামেদপ্রিয় নেতা, ভোগমন্ত্রে দীক্ষিত পাত্র-মিত্র-অমাত্য-উজির-রাজির-সেনাপতি-কোটাল প্রত্যেকেই শঙ্কিত হয়ে ভাবছেন সকলের যাবতীয় অপকর্মের হিসাব তো সংগৃহীত আছে বঙ্গবন্ধুদুহিতার মস্তিষ্কের করোটিতে। লক্ষনীয় মুজিববর্ষ নিয়ে কারও কারও অত্যাধিক উৎসাহ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রকৃত সৈনিকদের যেভাবে কোনঠাসা করে ফেলছিলো যা জননেত্রী যথাযথ অনুধাবন করেছেন বলেই তিনি রাশ টেনে ধরেছেন। মানুষের প্রয়োজনের সংগে উৎসবকে যুক্ত করেছেন এবং যারা বঙ্গবন্ধুকে আনুষ্ঠানিকতার মোড়কে বন্দী করতে চেয়েছিলো তাদের এই দশা আমাকে এই বিশ^াসে উদ্দীপ্ত করেছে যে শেখ হাসিনার ভেতর দিয়ে আমরা অকুতোভয় জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুকে আবার পেয়ে গেছি আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ প্রদর্শক হিসাবে।

তাই আমি আশ্বস্ত। 

আবেদ খান: সম্পাদক, দৈনিক জাগরণ।

(পুরনো লেখা। সংকলিত)

 




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top