বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র-দর্শন ও শেখ হাসিনা | মতামত | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮
মতামত
টুটুল রহমান

বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র-দর্শন ও শেখ হাসিনা

টুটুল রহমান

প্রকাশিত: ২১ মার্চ ২০২১ ২১:০৩ আপডেট: ২২ মার্চ ২০২১ ১৩:৪৮

টুটুল রহমান | প্রকাশিত: ২১ মার্চ ২০২১ ২১:০৩


লেখক

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্ব-পরিবারে নৃশংস ভাবে নিহত হবার পরই ‘মৃত’ পাকিস্তানের পুণর্জীবনের প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশে জোরালো ভাবে শুরু হয়।
স্বাধীনতার আগে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো পাকিস্তানের শোষনের মাত্রা এতটাই ছাড়িয়ে গিয়েছিল যে, পাকিস্তানের উদিয়নমান পূর্ব বঙ্গের মধ্যবিত্ত মুসলিম সমাজের একটা অংশ পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারাও হতাশায় ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। চাকরি, বাকরি ব্যবসায় তারা সমান সুযোগ পাচ্ছিলেন না। ধনী হওয়া তো দুরে থাক তাদের টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। সাধারণ মানুষও মার খাচ্ছিল পাকিস্তান শাসকগোষ্টির হাতে। এছাড়াও উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এই ঘোষনার পর পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক এক পেষে চরিত্রটি খোলাসা হতে থাকে। ভাষা আন্দোলন এদেশের মানুষের প্রথম প্রতিরোধ ও অর্জন। পুরো ২৩ বছরের শাসন আমলে তাদের নানা সিদ্ধান্ত বাঙ্গালী চেতনা, সংস্কৃতির মূলে আঘাত করেছে। এমন কি পাকিস্তানে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধের মতো ঘটনা যখন ঘঠেছে তখন এটা ধরে নেয়া ছাড়া আর উপায় ছিল না যে, পাকিস্তান সব ধর্মের দেশ হয়ে উঠবে না। মুক্তবুদ্ধির চর্চা এখানে করা সম্ভব নয়। তারা বাঙ্গালীর ভাষাসহ শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতি ধ্বংসের নানা পায়তারা শুরু করে।
মধ্যবিত্তের প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসেবে ততদিনে আওয়ামীলীগের শ্রেনী চরিত্র দাঁড়িয়ে গেছে। নেতৃতও¡ শেখ মুজিবের হাতে। আওয়ামীলীগ মধ্যবিত্তের প্রতিনিধিত্ব করলেও শেখ মুজিবুর রহমান তার অসাম্প্রদায়িক ও মানবদরদী চরিত্রের কারণে জন মানুষের আকাঙ্খা পূরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন। বাংলার স্বাধীনতার প্রশ্নে মুজিব তখন সব শ্রেনী পেশা, বর্ণ-ধর্মের মানুষের নেতা। মুক্তির প্রতীক।
১৯৯৬৬ সালের ছয় দফার মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নটি নিহিত থাকলেও সেটা উচ্চারণের সময় তখনো হয়নি। সামর্থ অর্জনে আরো কিছুটা পথ বাকি রয়েছে। উনসত্তুরের গণ আন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন, ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানের গড়িমসি ও ষড়যন্ত্র বাংলার স্বাধীনতার স্বপ্নকে জোড়ালো ভাবে জাগিয়ে তোলে। তত দিনের পূর্ব পাকিস্তানের সব শ্রেনীর মানুষ আন্দোলনের সাথে একাত্ব হয়েছে। আওয়ামীলীগও আত্মবিশ্বাসী দলে পরিণত হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ-অসাম্প্রদায়িক ও আত্মবিশ্বাসী আওয়ামীলীগের হাতে এ কারণে স্বাধীনতার নেতৃত্ব চলে আসে। যার কেন্দ্রে ছিলেন শেখ মুজিব। যিনি সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদে একনিষ্ট ছিলেন। যার আলোকেই স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচিত হয়। আর এখানেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শনের স্বরূপটি খুঁজে পাওয়া যায়।
যে আন্দোলন উদিয়মান মধ্যবিত্তরা শুরু করেছিল, সেই আন্দোলন সাধারণ মানুষের মধ্যে আগুন হয়ে ছড়িয়ে যায়। সেটা সম্ভব হয়েছিল শেখ মুজিবের দৃঢ় চেতনা, নেতৃত্ব ও স্বাধীনতার প্রতি একনিষ্ট থাকার কারণে। বাঙ্গালীর অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তাকে কোথাও আপোষ করতে দেখা যায় না। স্বাধীকার আন্দোল, স্বাধীনতা আন্দোলন, চূড়ান্ত যুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়েছে শেখ মুজিবের কারণে। তার আঙ্গুলি হেলনে। তার ডাকে মানুষ মন্ত্র মুগ্ধের মতো পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
বাঙ্গালীর অধিকার আদায়ের লড়াই সংগ্রামের নেতৃত্ব দেয়ার কারণে যাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে কারাগারে তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন পাকিস্তানের সাথে থাকা যাবে না। ধর্মীয় আবরণে পাকিস্তান একটা শোষনের রাষ্ট্রযন্ত্র। তবে মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ট পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যেতে হলে ধর্মের অবস্থানটা কি হবে সেটাও তো স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টাদের ভাবনার মধ্যে ছিল। এ কারণে সংবিধানের মূলনীতিতে গণতন্ত্রও যুক্ত হয়েছিল। বাংলাদেশ কোনো ধর্মীয় মতের ভিত্তিতে তৈরি হয়নি সে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছিল সংবিধানে।
বিভিন্ন তথ্যে উপাত্তে পাওয়া যায়, আওয়ামীলীগের মধ্যে একদল তরুন সমাজতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল সেই শুরু থেকে। তাদের লক্ষ্য ছিল সমাজতন্ত্র। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা থাকলেও আওয়ামীলীগের অনেক নেতাই সমাজতন্ত্র বা ধর্মনিরপেক্ষতা বিশ্বাস করতেন না। আওয়ামীলীগের ছদ্মাবরণে তারা যে সাম্প্রদায়িক চেতনাকে লালন করতেন তার প্রমান মিলেছে পরবর্তীতে। খন্দকার মোস্তাক তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
ভারত ও সোভিয়েত রাশিয়ার সহানূভূতি আদায় করতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা সংযুক্ত করা হয়েছিল এ কথা কোনো ভাবেই ঠিক নয়। শুধু মুজিব কেন আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা ভাসানী নিজেও ধার্মিক মানুষ হওয়া সত্বেও সমাজতন্ত্রের কথা বলতেন। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলতেন। হাজার বছরের ইতিহাসে বাঙ্গালীর ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে মুজিব লালন করেছিলেন বলেই তিনি অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছিলেন।
পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসার শক্তি হিসেবে বৈষম্যহীন সমাজ ও ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি ছিল সর্বপ্রথম। এই আন্দোলনে সমাজতান্ত্রিক একটা বিপ্লবের প্রচ্ছন্ন ছায়া দেখতে পেয়েছিল বলেই হাজার হাজার তরুন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। শেখ মুজিব সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা তার মর্মে গেঁথে নিয়েছিলেন।
দেশ স্বাধীন হবার পর সমাজতান্ত্রিক এই চেতনাধারীদের সাথে আওয়ামীলীগের একটা অংশের সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠে। মুজিব কোন পথে হাঁটবেন? প্রশ্নটি সামনে আসে। সংবিধানে নতুন রাষ্ট্রের দর্শন কি হবে সেটা তো উল্লেখ করাই আছে। মুজিবের প্রথম সংবিধানের মূলনীতি ছিল সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তা ও গণতন্ত্র।
সরাসরি সমাজতন্ত্রে যাওয়ার পথে দেশী-বিদেশী নানা বাঁধা তাকে ভারাক্লান্ত করে তোলে। দলীয় লোকদেরও এ পথে না হাঁটার চাপ ছিল সেটা বুঝতে পারা যায়। ফলে আওয়ামীলীগ ভাগ হয়। মুজিব সেই দৃশ্য ব্যথিত হৃদয়ে অবলোকন করেন। সংখ্যা গরিষ্ট না হলেও প্রভাবশালীদের একটা অংশের মতের কাছে তার কিছুই করার ছিল না।
আপত এই প্রশ্নটি অমীমাংশিত রেখে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে তিনি মনোযোগ দিলেন। যে বাঙ্গালীর দু:খ দুর্দশায় তিনি সারাজীবন কাতর ছিলেন, যারা নিরন্ন, সম্পদহীন তাদের এবার মুজিবের দেবার পালা। দিক- বেদিক ছুটেছিলেন। সমাজতন্ত্রী, গণতন্ত্রী সব দেশ চষে বেড়ালেন মুজিব।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, শেখ মুজিব দেশ পূর্নগঠনে যেখানে যাকে বসিয়েছেন সেখানেই সে লুটপাট করে দ্রুত ধনী হওয়ার প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন। এমনকি বিদেশী সহায়তার ত্রানও চুরি হয়েছে, লুট হয়েছে। চুরি-ডাকাতি বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের আইনশৃংখলা ভয়াবহ ভাবে খারাপ হয়ে যায়। সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে মুজিবের পক্ষে সেটা সামাল দেয়া সম্ভবপর ছিল না। নানা স্থানিক ও বৈশ্বিক ষড়্যন্ত্র তখন মাথা চাড়া দিচ্ছে।
তার শাসনামলে প্রভাবশালীদের অত্যাচার আবারও পাকিস্তানী শোষকদের কথা সাধারণ মানুষদের মনে করিয়ে দেয় নতুন করে। আবারও আশাভঙ্গের বেদনা জাতির সামনে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামীলীগ থেকে বেরিয়ে মানুষের এই ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে একটি বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে জাসদ গড়ে উঠে। তাদের ভুলভ্রান্তির জন্য ইতিহাসের কাঠড়ায় তারা হয়তো একদিন দাঁড়াবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি, মানুষের বিষাদগ্রস্ত মনকে আরো বিষিয়ে তোলা এবং সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমানকে মসনদে বসানোর যে অমার্জনীয় অপরাধ তারা করেছিল, সেটার জন্য জাসদকে কেউ কোনো দিন ক্ষমা করবে না। এরা আওয়ামীলীগেরই তরুন একটা অংশ। বিপ্লবের নেশায় ‘বুদ’ হয়ে থাকা পতঙ্গ মাত্র। ‘৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্ষমতা লিপ্সুদের যে রক্তের হলিখেলা হয়েছে ক্যান্টনমেন্টের ভেতর বাহিরে সেটা পুনরুল্লেখ করতে চাই না। এর জন্য কেউ কম দায়ি নয়।
কর্ণেল তাহের, জিয়াউর রহমান, খালেদ মোশারফদের ক্ষমতার দ্বন্দের কারণে কত তাজা, সরল সোজা প্রাণ বলি হয়েছে সে হিসাব ইতিহাস ঠিকই রেখেছে। তবে এ কথা সত্যি এসব রক্তপাতের উপকারভোগী হয়েছেন পরবর্তীতে জেনারেল এরশাদ। যে লোকটির মুক্তিযুদ্ধে কোনো অবদান নেই। জিয়াউর রহমান তাকে ডবল প্রমোশন দিয়েছিলেন।
অভ্যুত্থানের রক্তাত্ব পথ ধরেই কর্নেল তাহেরের কৃপায় নতুন জীবন ও ক্ষমতা পাওয়া জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশের মধ্যে ‘মৃত’ পাকিস্তানের পূর্নজীবনের কাজটি আরো একধাপ এগিয়ে নেয়া প্রক্রিয়া শুরু করেন। তার বহুদলীয় গণতন্ত্র বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রদর্শনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। বাংলাদেশ তার আসল রাষ্ট্র চরিত্র হারিয়ে সাম্প্রদায়িক ও ধর্মব্যবসায়ীদের রাষ্ট্রে পরিণত হতে থাকে। অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে থাকি আমরা। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় টিকে থাকতে ধর্মীয় দলগুলোকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিলেন। সেটা অবশ্যই বাংলাদেশ চেতনা বিরোধী ছিল।
ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে শুধু রাজনীতি করার অধিকার দেননি স্বাধীনতা বিরোধী জামায়তকে পূর্নবাসনের সব রকমের ব্যবস্থা করেছিলেন। শুধু জামায়াত নয় স্বাধীনতা বিরোধী অন্যদেরও সামাজিক ও রাষ্ট্রীয মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। জিয়াউর রহমান ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন, এদেশের মানুষকে নিয়ন্ত্রন করতে হলে ‘ধর্ম’ বড় ধরনের হাতিয়ার। মুজিবকে ব্যর্থ করার পর এদেশের অনেকের মধ্যেই পাকিস্তানের চেতন ধিকধিক করে জ্বলতে শুরু করেছিল। সেটাকেই পুঁজি করেছিলেন জিয়াউর রহমান। পাকিস্তানের মূল চেতনায় ছিল ধর্ম। নতুন বাংলাদেশ গঠনের নামে তিনি আবারও ধর্মীয় চিন্তাকে ঢুকিয়ে দিলেন রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে। আওয়ামীলীগ বা মুক্তিযুদ্ধের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা ভারত থেকে আমদানি করা, সমাজতন্ত্র নাস্তিক মস্কো আর চীনাদের কারবার এই চেতনা ততদিনে পাকিস্তানপন্থীরা বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে ঢোকাতে সক্ষম হয়েছিল। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে উলুধ্বনি দেয়া হবে, মেয়েদের সিদুর পড়তে হবে এমন প্রপাগান্ডা তাদের সব সময়ই ছিল। পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ভারত নিজের স্বার্থে বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছে এই ধারণের কথা বার্তা জোরেসোরে উচ্চারিত হতো পাকিস্তাপন্থীদের মুখে।
যা হোক বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শনের মধ্যে পাকিস্তানী ধর্মীয় রাষ্ট্রদর্শনের ‘বিষবৃক্ষ’ জিয়া রচনা করলেন। এরশাদ আরেক কাঠি উপরে উঠে অস্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ঘোষনা করে ‘মৃত’ পাকিস্তানকে বাংলাদেশের মধ্যে বাঁচিয়ে তুললেন যেন। ক্ষমতা লিপ্সু এরশাদ ক্ষমতায় থাকতে পীরের মুরিদ হয়েছিলেন। ধর্ম নিয়ে তার রাজনৈতিক ভন্ডামি ছিল প্রকাশ্য।
জিয়ার রাজনীতির উত্তরাধিকার খালেদার বিএনপি ‘৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে আওয়ামীলীগের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের চিন্তাটি ধুলোধুসরিত অবস্থায় পড়ে থাকে।
বিএনপির আমলেই বাংলাদেশে পাকিস্তানী কায়দায় ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি হতে থাকে। এর পেছনে জিয়ার আমলে পুর্নবাসিত হওয়া জামায়াত ও মুসলিম লীগের উত্তরসূরিরা নিরবে নিভৃতে কাজ করতে থাকেন। তাদের সঙ্গে চীনপন্থী মাওলানা ভাসানির অনেক শিষ্য ক্ষমতার ভাগ বাটোয়ারা নিতে যোগ দেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা নসাৎ করা এবং বাংলাদেশের মধ্যে পাকিস্তানকে জাগিয়ে তোলা।
‘৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসে। বিএনপির এই পাকিস্তানীকরণ ও দু:শাসনের জবাব মানুষ দেয় ভোটের মাধ্যমে। কিন্তু দীর্ঘদিন পর ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ায় আওয়ামীলীগ নিজেদের গোছাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নতুন করে কোনো রাষ্ট্রদর্শন নির্মানের সুযোগ তারা পায়নি স্বল্প সময়ে। তার মধ্যে দেশের উন্নয়নের দিকটাও তাদের ভাবতে হয়েছে। বেকারত্ব দারিদ্রতা দূরীকরণে তাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হয়।
২০০১ সালে বিএনপি অনেকটা জামায়ত সওয়ার হয়ে ক্ষমতায় আসে। এ কারণে ক্ষমতার ভাগ দিতে হয় জামায়াতকে। যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানাতে হয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন জামায়াত পাকিস্তানী চেতনা বাস্তবায়ন করার জন্য জিয়ার আমল থেকে প্রস্তুতি নিতে থাকে।
তারা ব্যাংক, বীমা, হাসপাতালসহ বিভিন্ন আয় বর্ধক প্রতিষ্ঠানের মালিক হতে থাকে। তাদের লোকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে থাকে। প্রকাশনা, শিল্প, সাহিত্যে তাদের ব্যাপক অংশগ্রহন দেখা যায় খালেদা জিয়ার আমলে। জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবিরের উপস্থিতি বাড়তে থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। তাদের নৃংশসতার খবর পত্র-পত্রিকায় উঠে আসে। জামায়াত শিবিরের সন্ত্রাসের ভয়ংকর চিত্র ভাবলে এখনো শিউরে উঠতে হয়। কেবল তাই নয়, জামায়াতের একটি চরম পন্থী অংশ বাংলাভাইয়ের জন্ম দেয়। স্বাধীন দেশে মানুষকে মেরে ঝুলিয়ে রাখার মতো লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে বিএনপি আমলে। ধর্মী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নামে মানুষ হত্যার এই উৎসব মানুষ প্রত্যক্ষ করে বিএনপি খালেদার আমলে।
প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য জামায়াতের এই অভুতপূর্ব উত্থানকে বিএনপি ঠেকাবার চেষ্টা করেনি বরং তাদেরকে প্রয়োজনে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে কাজে লাগানো যাবে এটা ভেবে আত্ম প্রসাদ লাভ করে। বরং ২০০৪ সালে আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতা ও শেখ হাসিনাকে চিরতরে মুছে ফেলার জন্য গ্রেনেট হামলা করে জামায়াতের প্রত্যক্ষ মদদে। বিএনপি তার অগ্রভাগে থাকলেও জামায়াত অস্ত্রসহ অন্যান্য জোগান দিয়েছিল।
জামায়াত-শিবির এক সময় বিএনপিকে ছাপিয়ে যায়। বিশেষ করে ২০১৩ সালে কাদের মোল্লার ফাঁসি ও দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়ের পর জামায়াত বিএনপিকে ছাড়াই তাদের শক্তি প্রদর্শন করে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরের সহিংসতায় বিএনপির সহযোগি বলিষ্ট শক্তি হিসেবে জামায়াত ছিল এটা পরিস্কার। ২০১৫ সালে বিএনপি যখন স্থিমিত হয়ে পড়লে জামায়াত-শিবির একাই পেট্রোল বোমায় পুরো বাংলাদেশেকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে দিয়েছে। বিএনপির বুলি সর্বস্ব রাজনীতিতে জামায়াতের আর সায় নেই। কারণ তাদের নেতাদের একে একে ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পর বিএনপি তাদের কোনো সহযোগিতাই করতে পারেনি। জামায়াত শিবির মাঠে নেই বলে খালেদার মুক্তি আন্দোলন বিএনপি জমাতে পারছেনা বলেই অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষন মনে করে।
ধর্মভিত্তিক উগ্র কোনো চেতনায় কোনো রষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠতে পারে না। উঠলেও ঠিকতে পারে না তার জ্বলন্ত উদারণ পাকিস্তান। বাংলাদেশ কখনো উগ্রকোনো ধর্মীয় চিন্তাকে গ্রহন করবে না সেটা পরিস্কার হয়ে গেছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনা এক যুগ ধরে দেশের সাধারণ মানুষকে সেটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। বিএনপি, জামায়াত যে বাংলাদেশ চেতনায় বিশ্বাস করে না সেটাও তিনি পরিস্কার করতে পেরেছেন। দেশও সামিল হয়েছে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায়। দুর্নীতি বিরোধী শুদ্ধি অভিযান চলছে। ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রদর্শন’ অভাবের যে যন্ত্রনা এতো দিন আমরা বয়ে বেরিয়েছি তাদের জন্য একটা আশার আলো জ্বলছে। এবার একটা সঠিক রাষ্ট্রদর্শন গড়ে উঠবে।
বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতা ও বৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার দর্শন জাতির সামনে হাজির করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। সেই সময়ে আওয়ামীলীগের মধ্যে মধ্যবিত্ত ও ধনিকশ্রেনীর প্রতিনিধিত্ব যারা করেছেন তারা স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলতে দেননি নিজেদের শ্রেনী স্বার্থে। সব মানুষের অবিসংবাদিত নেতা মুজিবকে ব্যর্থ করে দিতে এদের ভূমিকাও কম নয়। তারা মুজিবের খুব ঘনিষ্ট ছিলেন। এরাই মুজিবকে হত্যার পরিকল্পনার সাথে ছিলেন।
মুজিব সাধারণ মানুষের মুক্তির কথা ভাবতেন। শেখ হাসিনাও ঠিক তাই। বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রদর্শন তার বর্তমান আওয়ামলীগকে পুরোমাত্রায় ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শন হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রদর্শন। আওয়ামীলীগকেই সেই রাষ্ট্রদর্শন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। পাকিস্তানপন্থী জামায়াত-বিএনপির হাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শন প্রতিষ্ঠিত হবেনা কোনো কালে।

টুটুল রহমান, সম্পাদক অপরূপ বাংলা

 

 

 




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top