স্বাধীনতার ৫০ বছর : আমাদের প্রস্তুতি ও পদক্ষেপ | মতামত | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | বৃহঃস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮
মতামত

স্বাধীনতার ৫০ বছর : আমাদের প্রস্তুতি ও পদক্ষেপ

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

প্রকাশিত: ২৮ মার্চ ২০২১ ১৪:০৩ আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২১ ২১:৪৬

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ | প্রকাশিত: ২৮ মার্চ ২০২১ ১৪:০৩


স্বাধীনতার ৫০ বছর : আমাদের প্রস্তুতি ও পদক্ষেপ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর অর্থাৎ সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আমরা সবাই আনন্দিত এবং উজ্জীবিত। সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতের দিকেও তাকিয়ে আছি আমরা, আরো উন্নতি ও অগ্রগতি দিকে। একটা বিষয় এখন উপলদ্ধি করার প্রয়োজন আছে। সেটা হলো এখন শুধু আত্মতুষ্টির সময় নয়, প্রস্তুতির সময়ও, অর্থাৎ দেশের আপামর জন সাধারণের সামষ্টিক উন্নতি, অর্থনৈতিক, সামাজিক, জীবনযাত্রার গুনগত মানের উন্নতি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্জনের সংগ্রামের পেছনে দুটি কারণ ছিল, প্রথম পাকিস্তান বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক থেকে রাজনৈতিক ও স্বাধীকার। দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অর্থাৎ এই ভূ-খন্ডের মানুষের সার্বিক উন্নয়ন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে আমরা বর্তমান পর্যায়ে উপনিত হয়েছি।

তবে বিশেষ লক্ষ্যনীয় যে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য সচেষ্ট সবাই। কোনো সরকার কতটুকু অর্জন করেছে সেটা চুলচেড়া বিশ্লেষন এবং দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার কিন্তু বলা যেতে পারে একটা সন্তোষজনক জায়গা এসে দাঁড়িয়েছে অন্যান্য দেশের তুলনায় বিশেষ করে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায়।

ইদানিং যে দুটি বিশেষ অর্জন নিয়ে আলোচনা চলছে, একটা হলো দেশ এখন নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত এবং আমাদের প্রত্যাশা আমরা দ্রুত উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবো।

দিনে দিনে ব্যক্তিগত আয় ও সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে, কর্মসংস্থানের স্বল্পতা হেতু বেকার জনসংখ্যা (বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে) বাড়ছে, মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্য এবং অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রির (যাতায়াত, বাড়ি ভাড়া, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি) ব্যয়ভার বাড়ছে। যার ফলে দরিদ্র, নিম্নবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তদেরও আঘাত করছে।

আরেকটা হলো, এখন জাতি সংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ি অনুন্নত দেশের পর্যায় থেকে উন্নয়নশীল পর্যায়ে দেশ হিসেবে গণ্য হবে। কতগুলো সূচকের ওপর ভিত্তি করে এসব পর্যায়গুলো ঠিক করা হয়। সরকার অবশ্য ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময় নিয়েছে আনুষ্ঠানিক ভাবে উন্নয়নশীল দেশের ঘোষনা করার জন্য। এটা একটা সঠিক পদক্ষেপ, কারণ ন্যুনতম পাঁচ বছর লেগে যাবে সব প্রস্তুতি সস্পূর্ণ করার জন্য এবং অবস্থানটিকে টেকসই হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য।

কোভিড-১৯ এর মহামারির ফলে সমগ্র বিশ্বের সব দেশের স্বাস্থ্য-আর্থ-সামাজিক- রাজনৈতিক সব ক্ষেত্রে কতগুলো চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। গতানুগতিক ধারায় সব কিছু আবারও স্বাভাবিক হয়ে এবং এগিয়ে যাবে এটা প্রত্যশা করা মোটেও সমিচীন হবে না।

সামষ্টিক অর্থনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, আমাদের প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিটেন্স, মূল্যস্ফীতি এবং বৃহৎ শিল্প ও সেবাখাত মোটামুটি সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। তবে সেগুলোর সুফল সুষমভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌছায়নি। সমস্যাগুলো এখানেই।

দিনে দিনে ব্যক্তিগত আয় ও সম্পদের বৈষম্য বাড়ছে, কর্মসংস্থানের স্বল্পতা হেতু বেকার জনসংখ্যা (বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে) বাড়ছে, মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্য এবং অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রির (যাতায়াত, বাড়ি ভাড়া, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি) ব্যয়ভার বাড়ছে। যার ফলে দরিদ্র, নিম্নবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তদেরও আঘাত করছে।

কোভিড-১৯ এর মহামারিতে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি ধরা পড়েছে। আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবার কিছুটা উন্নতি হলেও রোগের পরের ধাপ এবং নিরাময়ের ক্ষেত্রে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগণ ভুগছে, শিশু ও মাতৃ অপুষ্টির হার, বিশেষ করে চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো আশংকাজনক। শিক্ষার হার বেড়েছে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় অংশ গ্রহনের মাধ্যমে, কিন্তু শিক্ষার মান বাড়েনি। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ অনেক ক্ষেত্রে বিষয়াদির যথার্থতায় কিছুটা ঘাটতি থাকাতে শিক্ষা শেষে কর্মজীবন এমনকি আত্মকর্মসংস্থানেও তরুণ ও যুবকদের বেগ পেতে হচ্ছে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যেমন ব্যাংক, বিমা, ব্যাংক বর্হিভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দুর্বলতার জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও দ্রুত ও জনগণের কল্যাণের জন্য সুষম হচ্ছে না। বিনিয়োগ আশানুরূপ নয় বিশেষ করে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে খুবই স্বল্প। এগুলো হলো মোটা দাগে আমাদের মূল সমস্যা। সব কিছু ছাড়িয়ে যেটা দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতি এবং অর্থের অপচয়।

নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় শক্ত প্রয়োগ এবং আইন ও নীতিমালার প্রয়োগ ও পরিপালনের অভাবে দিন দিন সব অর্জনগুলো হুমকির মুখে পড়ছে। এর ফলে হচ্ছে অর্থ-পাচার, কিছু সংখ্যক ব্যক্তির অযৌক্তিক ভোগ বিলাস এবং সাধারণ জনগণের ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ, যাতে স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্যগুলোও ব্যাহত হতে পারে।

আমাদের প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন বেশ কিছু বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেওয়া ও সেগুলো বাস্তবায়ন। প্রথমত, আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বিশেষ করে নিয়ন্ত্রনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, উন্নয়ন সহযোগি প্রতিষ্ঠানগুলো, বাজার ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা ও সুষম ক্ষেত্র আনা যা সব উদ্যোক্তা ও সৎ ব্যবসায়ীদের প্রেরণা যোগাবে। দ্বিতীয়ত, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় সংস্কার আনা, ব্যাংক কোম্পানী আইন, বিমা আইন, পুঁজিবাজার সম্পর্কিত আইন, প্রতিযোগিতা আইন এগুলোকে যুগোপযোগি করা এবং কঠোর ভাবে বাস্তবায়ন করা। তৃতীয়ত, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরো স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু করা।

সরকারি অর্থায়নে গ্রহণকৃত বিভিন্ন প্রকল্প, বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে দুর্নীতি অপচয় বন্ধ করা। প্রশাসনকে আরো স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করা। সরকারের রাজস্ব আদায় ও কর ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ, কর্মতৎপর, ব্যবস্থা ও জনগণবান্ধব হিসেবে পরিণত করতে হবে। একই সঙ্গে এসব ক্ষেত্রে সব প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম হতে হবে সুষম উন্নয়ন ও বৈষম্য হ্রাসের মাধ্যম হিসেবে। চতুর্থত, সরকারি প্রশাসন ও উন্নয়ন কার্যক্রম বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।

সব কিছুই রাজধানী এবং কিছু বৃহৎ শহর ভিত্তিক হয়ে যাচ্ছে, সেটার বিপরীত স্রোতে এখন যেতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, পল্লী অঞ্চলে সার্বিক উন্নয়ন, কৃষি ও সংশ্লিষ্ট, অত্যাশ্যকীয় ক্ষেত্র (পশুপালন, মৎস উৎপাদন ইত্যাদি) এবং পল্লী অঞ্চলে শিল্প বাণিজ্যের বিস্তার এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। পঞ্চমত, শিল্প বাণিজ্য প্রসারের ক্ষেত্রে রপ্তানি বহুমুখিকরণ, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোকে সরকারি ও বেসরকারি সব পর্যায়গুলোতে সম্প্রসারিত করতে হবে।

ইদানিং কোভিড-১৯ উত্তর সরকারি আর্থিক প্রণোদনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর এসব কর্মকান্ড মোটেও সন্তোষজনক নয়, এরকম যেন পুনরাবৃত্তি না হয়। ষষ্ঠত, দেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর, শৃংখলা এবং জবাবদিহিতা আনতে হবে। সব শেষে যেটা উল্লেখ্য যে- সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং সবক্ষেত্রে জনগনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে আমরা চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করতে হবে সেগুলোর সুরাহা করা অত্যন্ত কঠিন হবে, সেজন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আপামর জন সাধারণের সহযোগিতা ও কার্যকরী অংশগ্রহণ।

আমাদের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২০-২০২৫) ‘সকলের সঙ্গে সমৃদ্ধির পথে’ (প্রমোটিং, প্রস্পারিটি, অ্যান্ড ফস্টারিং ইনক্লোসিভনেস) এবং জাতিসংঘের ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য’ (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস্)- এদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে আমাদের নিজস্ব বাস্তবসম্মত কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

 

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক
অধ্যাপক ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top