ভিপি নূর যখন ইসলামপন্থী:রাজনৈতিক ফায়দা তোলার ব্যর্থ কৌশল | মতামত | Aporup Bangla | বাংলার প্রতিধ্বনি
ঢাকা | বৃহঃস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮
মতামত
‘কোনো মুসলমান আওয়ামী লীগ করতে পারে না।’

ভিপি নূর যখন ইসলামপন্থী:রাজনৈতিক ফায়দা তোলার ব্যর্থ কৌশল

টুটুল রহমান

প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল ২০২১ ১১:০৬ আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২১ ১৬:১৪

টুটুল রহমান | প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল ২০২১ ১১:০৬


লেখক

ডাকসুর সাবেক ভিপি, বর্তমানে ফেসবুকে আলোচিত, লাইভ বক্তা নুরুল হক নূরকে নিয়ে লেখার কোনো ইচ্ছে ছিল না। অতীতেও তিনি নানা উত্তেজক, আপত্তিকর কথা বলেছেন। সেগুলো ডিশ আলমের গান, অভিনয় আর শিশুবক্তা’র মাঠ গরমের কৌশল হিসেবে ধরে নিয়েছি। কিন্তু ইদানিং তার লাইভের বক্তব্য সীমা ছাড়িয়েছে। বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরকে কেন্দ্র করে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিন দেশে যে বিভীষিকা হয়ে গেলো তারপর থেকে নূরের বক্তব্য একেবারেই লাগাম ছাড়া হয়ে পড়েছে। আরো যদি বলি, হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের রিসোর্টকান্ডের পর নূরের এমন ইসলাম প্রীতি অতীতে আর কখনো দেখা যায়নি। ধর্মপ্রীতি মানুষের থাকতেই পারে। এটা নিয়ে আপত্তির কিছু নাই। কিন্তু আপনি যখন কে মুসলমান নন, কে মুসলমান সেই ফতোয়া দিচ্ছেন এবং একটি দলের লোকদের (যে দলটি স্বাধীনতার নেতৃত্ব দিয়েছে, বাংলাদেশের কি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে লড়াই করেছে) মুসলমান হিসেবে ‘বাতিল’ করে দিচ্ছেন তখন কিন্তু এমন বক্তব্যের দায় তাকে নিতেই হবে।
প্রবাদে আছে, পাগলে কি না বলে ছাগলে কি না খায়। নুুরুর দশা তো এখন এমন। ছাত্রলীগ করতো এক সময়। তার যোগ্যতা, মেধা বা নেতৃত্ব দেয়ার যে লেভেল তাতে ভালো পদ পাওয়া, রাজনৈতিক ক্যারিয়ার খুব যে লাভজনক হতো না সেটা সময়মতো বুঝতে পেরে নূর সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে কোটা বিরোধী আন্দোলনে নামলেন। সেখানে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের কটাক্ষ করে স্বাধীনতা বিরোধীদের সমর্থন পেলেন। প্রধানমন্ত্রী কোটা বাতিলের পরেও সেই ছাত্র অধিকার পরিষদ আছে। শুধু আছেই না তারা এখন বিভিন্ন শাখা খুলেছে। রাজনৈতিক দল হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। ভবিষ্যতে এমপি, মন্ত্রী হওয়ার খায়েস তাদের আছে বলে মনে হয়।

রাজনীতিতে ধর্মকে এনে যে সুবিধাটা আপনি নিতে চাচ্ছেন সেটা নিতে গিয়ে অনেকেই ‘ফেল’ মেরেছে। ভারতকে গালি দিয়ে ধর্মভীরুদের দলে টেনে যে সুবিধা নিতে চাচ্ছেন সেটা অনেকেই করতে গিয়ে নাকে-মুখে কাঁদাপানি খেয়ে চলে গেছে। আপনার নিশ্চয়ই জিয়ার কথা মনে পড়বে। রাজনীতিতে পাকিস্তানের পর ধর্মের বিষবৃক্ষ তিনিই রোপণ করেছিলেন


নূর কিন্তু বেশ কিছু বিষয় মাথায় নিয়ে এ পথে নেমেছেন। প্রথমত তিনি জানেন, ইসলামপ্রীতি দেখালে এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের সহানূভূতি পাবেন। ভারত যে ইসলামের প্রতিপক্ষ এই পুরনো রাজনীতির খেলাটাকে আবার জমিয়ে তুলতে হবে। আর রাজনীতির ব্যয় বহনের জন্য প্রবাসীদের কাছে ধর্ণা দিতে হবে। এ কারণে ক্ষেপিয়ে তুলতে হবে প্রবাসীদের। নূর এই কাজগুলো করেছেন খুব সুচারুভাবে। অন্যদিকে দেশে গণতন্ত্র নাই- বিএনপি জামাতের এই বুলি কপচিয়ে তাদের সমর্থন নূর আদায় করতে পেরেছেন। এমনকি দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিও করেছেন বারবার। এখন দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মুক্তির জন্য একটা ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে গেলেই ষোলকলাপূর্ণ হয়।
সরকারকে গালিগালাজ করা ছাড়া নুরুর আর কি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রকাশ পায় বলুন তো? তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে অর্জন কি? তার পরিণতি কি মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো হবে না? একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি হয়েছেন সেই ‘ট্যাগ’ বিক্রি করে কতদিন আর খাওয়া যায় বলুন।

লেখাটা শুরু করেছিলাম কে মুসলমান আর কে মুসলমান না এই প্রসঙ্গে। গত কয়েকদিন ধরে একটি ভিডিও সোস্যাল মিডিয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। যেখানে ভিপি নুর বলছেন, যারা আওয়ামী লীগ করেন তারা কোনো ভাবেই মুসলমান হতে পারে না? আরো অনেক কথা বলেছেন সেগুলো উল্লেখ নাই করলাম। তার ভাষায় আলেম-ওলামাদের আওয়ামীলীগ অত্যাচার করছে এ কারণে কোনো আওয়ামীলীগের কেউ মুসলমান হতে পারে না।
নূর মুখে একটু লাগাম দিন। দেশে প্রচুর মানুষ আছে যারা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে। আমিও করি, আমার দাদা করতেন, আমার বাবা করতেন, আমার ভাই করে। তাহলে কি আমরাও ইসলাম ধর্ম থেকে খারিজ হয়ে গেছি? একজন লোক আওয়ামীলীগ করার জন্য মুসলমান থাকবে কি থাকবে না সেই সার্টিফিকেট কি আপনি দিবেন? আপনি তো বিরাট ইসলামপন্থী!
রাজনীতিতে ধর্মকে এনে যে সুবিধাটা আপনি নিতে চাচ্ছেন সেটা নিতে গিয়ে অনেকেই ‘ফেল’ মেরেছে। ভারতকে গালি দিয়ে ধর্মভীরুদের দলে টেনে যে সুবিধা নিতে চাচ্ছেন সেটা অনেকেই করতে গিয়ে নাকে-মুখে কাঁদাপানি খেয়ে চলে গেছে। আপনার নিশ্চয়ই জিয়ার কথা মনে পড়বে। রাজনীতিতে পাকিস্তানের পর ধর্মের বিষবৃক্ষ তিনিই রোপণ করেছিলেন। আজ তার ১৯ দফা কোথায়? ইসলামের নামে যুদ্ধাপরাধী জামায়াতকে সমর্থন দিয়ে তার দল আজ কোথায়? এগুলো কি বুঝতে পারেন মি. নূর?
আজ নূর হেফাজতকে সমর্থন দিচ্ছেন। তাদের মিছিলে প্রচুর লোক হয়। এই লোকবল আপনার দরকার। তারা ভারত বিরোধী, মোদি বিরোধী, ইসলাম অন্ত:প্রাণ। নিজের রাজনৈতিক শক্তিবৃদ্ধির জন্য এদের দরকার। তাই তো? কিন্তু এরা যে কাজটা করলো সেটা কি ভেবেছেন ডাকসুর সাবেক ভিপি? স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশটাকে তছনছ করে দিলো। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালে আগুন দিলো। নূরকে একটা প্রশ্ন আমি করতে চাই সেটা হলো, এরা কথায় কথায় দেশের সম্পদ নষ্ট করে কেনো? বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙ্গে কেন? এই বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু কি তাদের শত্রু? তারা ইসলামকে হেফাজত করছে। তারা বারবার বঙ্গবন্ধুকে আঘাত করে কেন? বঙ্গবন্ধু কি ইসলামের শত্রু ছিলেন?

একজন সাধারণ মানুষের ভারত বিরোধিতা, ইসলাম পালন আর নূরের ভারত বিরোধিতা, ইসলাম নিয়ে কথা বলা এক জিনিস না। একজন মামুনুল হক ইসলাম প্রীতি দেখিয়ে যে কাণ্টন, একজন ‘বনসাই’ বক্তা নৈতিকতার পথ বাতলে দিতে ওয়াজ করে রাতভর যেভাবে পর্ণ দেখেন, ‘মানবিক’ বিয়ে করেন-এদের দ্বারা কোনো কিছুই নিরাপদ নয়। ইসলাম কিংবা ভারতবিরোধী চেতনা বিক্রির রাজনীতিকে এদেশের মানুষ সবসময় প্রত্যাখ্যান করে। এ কারণে নুরুল হক নূররা আসে, কিছুদিন গলাবাজী করে তারপর হারিয়ে যায়। সত্যিকার ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ এগিয়ে যায়। এখানে নামাজ হয়, মন্দিরে পুজো হয়, প্রার্থনা হয়। নজরুলের গান বাজে। জসিম উদ্দিন, ফররুখ আহমদ পঠিত হয়। ররীন্দ্রনাথের গান আজো আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। সুতরাং উত্তেজনা ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার ‘হেফাজতী’য় কৌশল নূরের কোনো কাজে আসবে না।

লেখক: সম্পাদক, অপরূপ বাংলা।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top