মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২ , ১৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

modhura
Aporup Bangla

কেমন গণমাধ্যম চাই

মতামত

নিয়ন মতিয়ুল

প্রকাশিত: ১০:৩৪, ৩০ অক্টোবর ২০২২

আপডেট: ১০:৩৭, ৩০ অক্টোবর ২০২২

সর্বশেষ

কেমন গণমাধ্যম চাই

ছবি/ সংগ্রহ

প্রযুক্তির বিস্ময়কর উন্নতির যুগে তথ্যের মহাসমুদ্রে হাবুডুবু খেতে খেতে ‘কেমন গণমাধ্যম চাই’ প্রশ্নটি নিশ্চিতভাবেই ভাবনায় ফেলে দেয়। তথ্যের মানচিত্রবিহীন বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যখন গণমাধ্যমের সমান্তরালে অবস্থান নেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন সংবাদমাধ্যমের প্রতি জনগণের প্রত্যাশার প্রশ্নটি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে।

আর, বিশ্বব্যাপী যে হারে কর্তৃত্ববাদী সরকারের বিস্তার ঘটছে, তাতে দিন দিন গণমাধ্যমের পরিধি যেমন গুটিয়ে আসছে, তেমনি বিকৃতিও ঘটছে। জনতুষ্টিবাদী শাসকরা নানা কৌশলে সংবাদমাধ্যমের ওপর বিশেষ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। কখনও আবার রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারও করছে। যেখানে সংবাদ নীতিনির্ধারকরা জনস্বার্থের ইস্যুগুলোতে ক্রমাগত স্বনিয়ন্ত্রিত ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন। ‘আমাদের হাত বাঁধা নেই, আমাদের চোখ খোলা’, ‘মুক্তপ্রাণের প্রতিধ্বনি’- এমন ঝাঁঝালো স্লোগানের শক্তিও দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে।

অবশ্য, এমন ভয়াবহ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে জনমনস্তত্ত্বে ঘটছে একেবারেই উল্টো ঘটনা। জনগণ আরও বেশিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত সংবাদমাধ্যমের ওপর। তারা সমাজ, রাষ্ট্রের পাশাপাশি সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে জনস্বার্থের গভীরতার বিষয়টি জানতে বিশেষ আগ্রহী। গোষ্ঠিস্বার্থে পরিচালিত সরকারের জনস্বার্থবিরোধী পদক্ষেপের অন্তরালের সত্য জানতেও বেশি উদগ্রীব। আর জনগণের এসব কৌতুহল অবদমিত করা সরকার নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের বাইরে আরও ভালো সংবাদ প্রত্যাশা করেন তারা। এমনকি, এজন্য তারা দাম দিতেও রাজি।

আগেই বলেছি, বিশ্ব এখন তথ্যের মহাসমুদ্রে ভাসছে। তবে এক্ষেত্রে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, মহাসমুদ্রের পানি যেমন পানের অযোগ্য, তেমনি সব তথ্যই জনস্বার্থে নিবেদিত নয়। সমুদ্রের পানি পান করার জন্য যেমন বাষ্পীভবনের মাধ্যমে লবণ আর বিশুদ্ধ পানি আলাদা করা হয়, তেমনি বিদ্যমান সব তথ্যেরও যাচাই, বাছাই করতে হয়। ফিল্টারিং করতে হয়। আর সে ক্ষেত্রে বড় উপায় হচ্ছে গণমাধ্যম। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা অসম্পাদিত তথ্যের বেশিরভাগই মূলত উদ্দেশ্য প্রণোদিত। বেশিরভাগই জনস্বার্থের বিপরীতে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থেই সেসব তথ্য ছড়ানো হয়। এমন তথ্যের মহাসমুদ্র থেকে সত্য তথ্য ছেকে নিয়ে যাচাই, বাছাই করে সম্পাদিত তথ্য হিসেবে গণমাধ্যম প্রকাশ করে। এসব কারণেই তথ্যের মহামারিতে আক্রান্ত জনগণের সবচেয়ে ভরসা, নির্ভরতার জায়গা গণমাধ্যম।

তবে এ প্রসঙ্গে বলে রাখা অনিবার্য, পুঁজিবাদ, দূষিত রাজনীতি আর করপোরেট স্বার্থের মোহে প্রচলিত ‘মহৎ আর নির্মোহ’ সংবাদমাধ্যম দিন দিন জনগণের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। জনস্বার্থ চাপা পড়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক আর করপোরেট স্বার্থের নিচে। বিস্ময়কর শোনালেও এটাই বাস্তবতা, সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে নীতিবান, আদর্শবাদী জনপ্রিয় পরিচালকরাও করপোরেট প্রলোভনে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে নিজ নিজ অবস্থান খুইয়ে ফেলছেন। আর তাতে তাদের ওপর জনগণের সীমাহীন প্রত্যাশা দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে।

আরেকটি আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বামধারার নীতিনির্ধারকদের ক্রমাগত সীমিতভাবনা, ক্রমপ্রসারমাণ অর্থনীতিতে অভিযোজিত হতে না পারা আর অভিজাত দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই মূলত বিশ্বজুড়ে ডানপন্থিদের ক্ষমতায়নের হার বাড়ছে। যারা কর্তৃত্ববাদের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাকে স্থায়ী করতে সীমিত করে ফেলছে সংবাদমাধ্যমের পরিধিকে। এর পরিচালক, নীতিনির্ধারক এমন কি অর্থদাতাদেরও তারা একচেটিয়াকরণ করছে। ফলে নির্মোহ চরিত্র ক্ষয়ে গিয়ে ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা সরকারি স্বার্থেই পরিচালিত হচ্ছে বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম। যা দমবন্ধ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যেখানে জনগণ এবং জনস্বার্থের ইস্যুগুলো একেবারেই ‍উপেক্ষিত। 

এমন প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা আরও বড় হচ্ছে, আরও প্রসারিত হচ্ছে। নির্ভরশীল গণমাধ্যমের জন্য হাহাকার বাড়ছে। অবশ্য বিগত দেড় দশক ধরে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটভিত্তিক যে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রসার ঘটছে, তার প্রবল ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে আমাদের দেশেও। গত প্রায় এক দশক ধরে প্রবলভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সংবাদভিত্তিক অনলাইন। তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক সাফল্যের হাত ধরেই সবার হাতে হাতে তাৎক্ষণিক ঘটনা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। অনলাইনের বদৌলতে চলমান তথ্যের মহাসড়কে হাঁটতে শুরু করেছে সাধারণ জনগণও। তবে এক্ষেত্রে চলমান ঘটনার বাইরে অনুসন্ধান খুবই সীমিত। যে কারণে প্রত্যাশার শতভাগ পূরণে অনেকটা পিছিয়ে থাকছে অনলাইন সংবাদমাধ্যম।

এদিকে, অর্থনীতির জটিল এক সূত্র ‘মন্দায় বিনিয়োগ বাড়াও’ নীতিতে অতি সংকটের মধ্যেও দেশে কয়েক দশকে বড় বড় বিনিয়োগের বহু সংবাদমাধ্যম বা সংবাদপত্র ভূমিষ্ট হয়েছে। জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে পরিমাপের আগেই তারা সরকার কিংবা সরকারের তথ্য সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের বিশেষ নজর কেড়েছে। দরবৃদ্ধির মাধ্যমে সরকারি বিজ্ঞাপনের বিপুল রাজস্ব ঘরে এনে তারা টেকসইও হয়েছে। দেশীয় ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে নিজেদের দাবিও করছে। তবে সরকারি বিজ্ঞাপনের বিশেষ আশির্বাদ ছাড়াই জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে সেরা হয়ে উন্মুক্ত বিজ্ঞাপনের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারেনি বেশিরভাগ সংবাদপত্র। আর জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পদ্ধতি উদ্ভাবন না হওয়ায় সংবাদকর্মীদেরও কোনো পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়নি। এমন বাস্তবতায় বেশিরভাগ গণমাধ্যম টেকসই হলেও জনগণের হয়ে উঠতে পারেনি। প্রত্যাশাও সেভাবে পূরণ হয়নি। 

এমনকি এই সময়ে এসে চায়ের টেবিলে অনানুষ্ঠানিক আলাপ আলোচনাতেও সংবাদমাধ্যমের নির্মোহ চরিত্র অনুসন্ধানের গরজ আর নেই কারো মধ্যে। বেশিরভাগ সংবাদকর্মীর কাছেই এটা আর দশটা পেশা বা জীবিকার উৎস। অবশ্য অন্য পেশার চেয়ে এখানে ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তা ভয়াবহ। গণমাধ্যমের অনেক শিক্ষার্থীই তাই এমন অনিশ্চয়তায় গা ভাসাতে রাজি নন। তারা ভিন্ন পেশার সন্ধান করে এই পেশা ত্যাগ করছেন। ঠিক এমন বাস্তবতায় জনগণের স্বার্থে কোনো বাধ্যবাধকতায় যে গণমাধ্যম আটকে থাকবে না- সেটা বলাই বাহুল্য।

এক্ষেত্রে আবারও সেই আগের প্রশ্ন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আসলেই সক্ষম কিনা গণমাধ্যম? অবশ্য জটিল এই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আরও কিছু বিষয় আলোচনার দাবি রাখে। মূলত, দেশে বিগত কয়েক বছর ধরে কোটিপতির সংখ্যা হু হু করে বেড়ে চলেছে। দেশীয় অর্থনীতি যতই বড় হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় অর্থ বেহাত হওয়ার প্রবণতা ততই বাড়ছে। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো থেকে প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। উন্নয়ন দর্শন এখন অনেকটাই প্রদর্শিত একচেটিয়া ক্ষমতামুখী রাজনৈতিক অভিলাষের অংশ। যেখানে পরিবেশ, প্রতিবেশ, জনগণের ভবিষ্যৎ তেমনভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। 

এমন পরিস্থিতিতে সরকার পরিচালনাকারী রাজনৈতিক দলগুলো যেমন তাদের গুণগত মান হারিয়ে ফেলে, তেমনি জনগণের আস্থার জায়গাটাও নড়বড়ে হয়। এই ফাঁকে আমলাতন্ত্রের পাশাপাশি বিশেষ গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে যারা গণতন্ত্র আর সুশাসনকে দলিত-মথিত করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে। এর ফল ভোগ করতে হয় জনগণকে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও হারাতে হয় সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। প্রকৃতপক্ষে সরকার আর রাষ্ট্রের মধ্যে ঘটে চলা ঘটনা অপ্রকাশিত থাকার কারণেই এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। যাতে সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এর পেছনে কাজ করে মূলত সত্য তথ্যের ঘাটতি।

ভেতর-বাইরের বিপর্যয় থেকে রাষ্ট্র, সরকার আর জনগণকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যই মূলত গণমাধ্যমের ভূমিকা অতি জরুরি হয়ে পড়ে। যা গবেষণা আর অনুসন্ধানের মধ্য ‍দিয়ে সত্য তুলে ধরে সংকটের সমাধানের পথ বাতলে দিতে পারে। আর এই চরিত্রের যখন বিকৃতি ঘটে, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন এমন সংকটে সমাধান দিতে অক্ষমতা প্রকাশ পায়। জনগণের সীমাহীন প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় শেষ অবধি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গণমাধ্যম।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, এমন বিপর্যয়কাল চলছে বিশ্বজুড়েই। সরকারের নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ পুঁজির প্রভাব, রাজনৈতিক মেরুকরণ, গোষ্ঠী স্বার্থের প্রভাবে ভারাক্রান্ত গণমাধ্যম। এক্ষেত্রে জনগণের হয়ে কাজ করা আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। আর সেই চাহিদার প্রেক্ষিতেই জনগণের প্রত্যাশার শতভাগ পূরণে নতুন এক ধারা তৈরি হচ্ছে। এক্ষেত্রে পুঁজির জন্য বিশেষ গোষ্ঠি বা রাজনীতির কাছে জিম্মি না হয়ে সরাসরি জনগণের অর্থেই পরিচালিত হতে চায় গণমাধ্যম। যা জনগণের হয়ে, জনস্বার্থেই কথা বলবে। পরিচালিত হবে জনগণের চাওয়া-পাওয়াতে।

বিশ্বজুড়ে ইতোমধ্যেই সেই ধারা শুরু হয়েছে। পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশেও। তবে সেই ধারার টেকসই ব্যবসায়িক মডেল তৈরির জন্য বিশেষভাবে দরকার একবিংশ শতকের মেধাবী ডানপিটে প্রজন্ম। তাদের হাত ধরেই গণমাধ্যমের নতুন ধারা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হবে। 

লেখক: বার্তা সম্পাদক, দৈনিক আনন্দবাজার

সর্বশেষ

জনপ্রিয়