রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩ , ১৫ মাঘ ১৪২৯

modhura
Aporup Bangla

মেয়েজামাই হয়ে উঠতে পারেন এরদোয়ানের বিষফোড়া

সারাবিশ্ব

অপরূপ বাংলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭:২৬, ২৫ জানুয়ারি ২০২৩

সর্বশেষ

মেয়েজামাই হয়ে উঠতে পারেন এরদোয়ানের বিষফোড়া

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আত্মীয়স্বজন ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠছেন। তাঁর সরকারকে আত্মীয়স্বজনের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল সরকার হিসেবেই এখন দেখা হচ্ছে। এ নিয়ে যুক্তরাজ্যের সাময়িকী ইকোনমিস্ট এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠরা কীভাবে সরকারের সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছেন, তা তুলে ধরা হয়েছে।

আল-জাজিরার অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্কে আগামী ১৪ মে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওই নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বিরুদ্ধে আরও বেশি ‘এক নায়ক’ হয়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। আগামী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হিসেবে এরদোয়ান আবার লড়বেন।

গত শনিবার তুরস্কের উত্তর-পশ্চিম বুরসা প্রদেশে অনুষ্ঠিত যুব সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমি স্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানাই যে আমরা আপনাদের সঙ্গে আমাদের পথ ভাগ করে নেওয়ার ভাগ্য পেয়েছি। আপনারা আমাদের মূল্যবান তরুণ, যাঁরা আগামী ১৪ মে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। বুরসায় এরদোয়ান বলেন, তিনি আগামী ১০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবেন। তারপর দেশটির সুপ্রিম ইলেকশন কাউন্সিল নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেবে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো প্রার্থী যদি ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পান, তাহলে ২৮ মে দ্বিতীয় দফার ভোট হবে। তুরস্কের পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আগামী ১৮ জুন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এরদোয়ান আগেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভোট এগিয়ে আনা হতে পারে। এখন তেমনটাই দেখা যাচ্ছে। এরদোয়ান ২০০৩ সাল থেকে তুরস্কের ক্ষমতায় আছেন। প্রথম তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আর ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে প্রেসিডেন্ট পদে আছেন।

২০১৮ সালে এরদোয়ান একটি নতুন শাসনব্যবস্থা চালু করেন। এই ব্যবস্থা দেশটির প্রেসিডেন্টের হাতে বেশির ভাগ ক্ষমতা দেওয়া হয়। আগে প্রেসিডেন্টের পদটি ছিল মূলত আনুষ্ঠানিক পদ। নতুন ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন একই দিনে অনুষ্ঠানের নিয়ম করা হয়। তুরস্কের বিরোধীরা দেশটির অর্থনৈতিক মন্দা, নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা সংকুচিত করার জন্য ৬৮ বছর বয়সী এরদোয়ানকে দায়ী করছেন। তাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে ‘এক ব্যক্তির শাসন’ব্যবস্থা চালুর অভিযোগ করছেন। আর এই শাসনের ভিত্তি হচ্ছে তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা। তুরস্কের নতুন অর্থনৈতিক মডেলের পেছনে কে রয়েছেন? দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক নেতা এবং সাবেক বিচার ও উন্নয়ন বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করা হলে, সবাই একটি নামই বলেছেন।

সে নামটি হচ্ছে—বেরাত আলবায়রাক। তিনি দেশটির অর্থমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি জ্বালানিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছিলেন। কিন্তু আলবায়রাক দায়িত্ব নেওয়ার দুই বছরের মাথায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। কারণ, এই সময়ের মধ্যে তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক রিজার্ভ এবং এর গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। দেশটির মুদ্রা লিরার দাম মার্কিন ডলারের বিপরীতে অর্ধেকেরও বেশি কমে আসে। আলবায়রাক সরে দাঁড়ালেও তাঁর উত্তরাধিকার এখনো টিকে আছে।

অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, তুরস্কের অর্থ মন্ত্রণালয় এখনো আলবায়রাকের সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণে। দেশটির বর্তমান অর্থমন্ত্রী নুরেদ্দিন নেবাতি আলবায়রাকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নুরেদ্দিন এখনো তাঁর বন্ধুর নীতিকেই অনুসরণ করে যাচ্ছেন। স্থানীয় মুদ্রা লিরাকে শক্তিশালী করতে বৈদেশিক রিজার্ভ বিক্রি করতেই পিছপা হন না তিনি। প্রশ্ন হচ্ছে, কে এই আলবায়রাক? তিনি হচ্ছেন এরদোয়ানের মেয়েজামাই। তিনি এরদোয়ানের বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত। এরদোয়ানের সব কথাতেই তিনি সায় দেন বলে ‘ইয়েস ম্যান’ হিসেবেও এরদোয়ানের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিতে (একে) কানাঘুষা আছে।

এরদোয়ান দলের টেকনোক্র্যাট বা সাবেক নেতাদের বাদ দিয়ে সুযোগসন্ধানী ও আত্মীয়দের বড় পদে জায়গা দিয়েছেন বলে অভিযোগ। এর পেছনে অবশ্য কারণ রয়েছে। ২০১৬ সালে এরদোয়ানকে হটাতে তুরস্কে অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল। এর পর থেকে এরদোয়ান অনেক সতর্ক। তাঁর প্রাসাদের এক কর্মকর্তা বলেন, অভ্যুত্থানচেষ্টার পর থেকে এরদোয়ান কেবল তাঁর প্রতি অনুগত ও পরিবারের সদস্যদের সরকারের বিভিন্ন পদে বসাতে শুরু করেন। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদেরও তিনি সরিয়ে দিতে কুণ্ঠিত হননি।

এমনকি পুরোনো রাজনৈতিক নেতাদেরও দূরে ঠেলে দিয়েছেন। তুরস্কের ২০০০ সালের অর্থনৈতিক উন্নতির পেছনের কারিগর বলে ধরে নেওয়া হয় এরদোয়ানের একসময়ের ঘনিষ্ঠ আলি বাবাকান ও মেহমেত সিমসেককে। এ ছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেত দাভুতোগলুও তাঁর ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

কিন্তু ২০১৬ সালেই তাঁদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় এরদোয়ানের। পরে দাভুতোগলু ও বাবাকান যথাক্রমে গেলেসেক ও ডেভা নামে নতুন দুটি রাজনৈতিক দল গড়েছেন। এরদোয়ানের সঙ্গে তাঁদের এই দূরত্বের পেছনে আলবায়রাকের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেন দাভুতোগলু। এরদোয়ানের সরকারে শুধু আলবায়রাক নন, তাঁর আরও বেশ কয়েকজন আত্মীয় প্রভাব বিস্তার করেছেন।

এর মধ্যে একজন হচ্ছেন এরদোয়ানের ছেলে বিলাল এরদোয়ান। তিনি এরদোয়ানের দলের নেতাদের নানা দিকনির্দেশনা দেন। এ ছাড়া দলটির যুব শাখার দায়িত্বও তাঁর হাতে। গত বছর তেহরানে এক সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বিলালকে দেখা যায়। এর বাইরে বাবার সঙ্গে উজবেকিস্তান সফরেও যান বিলাল। তবে তুরস্কে সবচেয়ে বড় তারকা বলতে হয় এরদোয়ানের আরেক মেয়েজামাই সেলসুক বায়রাকতারকে। তিনি বায়রাকতার নামের একটি প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা। এটি মূলত প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান। তুরস্কের ড্রোন কর্মসূচির সাফল্যের পেছনে বায়রাকতারের অবদান রয়েছে বলে ধারণা করেন বিশ্লেষকেরা। তুরস্কে বায়রাকতার বিরোধী দলের মধ্যেও জনপ্রিয়। অবশ্য এখনো তিনি নিজেকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন।

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, আলবায়রাক এখনো তাঁর সাবেক মন্ত্রণালয়, একে পার্টির কিছু সংসদ সদস্যের মধ্যে প্রভাব ধরে রেখেছেন। এ ছাড়া তাঁর বড় ভাই শেরহাত দেশের একটি বড় গণমাধ্যম গ্রুপের প্রধান। তুর্কভাজ নামের এই গণমাধ্যম গ্রুপ সরকারপন্থী হিসেবে পরিচিত। তবে আলবায়রাককে সব তুর্কিরা সমান চোখে দেখেন না। দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের নামে ১৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক রিজার্ভ উড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। একসময় তাঁকে এরদোয়ানের উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু তাঁকেই এখন এরদোয়ানের বিষফোড়া হিসেবে দেখা হতে পারে।

এনসি/

সর্বশেষ

জনপ্রিয়