রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩ , ১৫ মাঘ ১৪২৯

modhura
Aporup Bangla

আজি এই বিজয়ের দিনে 

মতামত

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা

প্রকাশিত: ০০:০৪, ১৬ ডিসেম্বর ২০২২

আপডেট: ০০:২৮, ১৬ ডিসেম্বর ২০২২

সর্বশেষ

আজি এই বিজয়ের দিনে 

অলংকরণে : হাফিজ

আজ আমাদের বিজয় দিবস। সমগ্র দেশ পরিকীর্ণ মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে উৎসবমুখর জনতার সমাবেশে। বিপুল সংখ্যক বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের মূল্যে অর্জিত স্বাধিকার ও গণতন্ত্রের উদ্যাপন এই বিজয় দিবস। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর-হায়েনাদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে বিজয় অর্জনের দিন। অপরিসীম ত্যাগ ও উৎসর্গের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনা বিজয় উদযাপন যেকোন রাষ্ট্রের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ, আর বাঙালির জন্য বিশেষ অর্থবহ।


একান্ন বছর আগে এই দিনে বিজয় এসেছিল, কারণ সমগ্র জাতি এক অভিন্ন লক্ষ্যে দৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। আমরা যুদ্ধ করেছি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যদিও তিনি ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। যুদ্ধরত ঐক্যবদ্ধ বাঙালির লক্ষ্য ছিল শুধু দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে বিতাড়িত করা নয়, শুধুই স্বাধীনতা অর্জনও নয়; চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে পাকিস্তানি শাসনামলের সব অন্যায়, অবিচারের চির অবসান ঘটবে। চাওয়া ছিল উদারতার চর্চা হবে, সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না। চাওয়া ছিল জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিক সমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অধিকার ভোগ করবে। চাওয়া ছিল দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, অর্থাৎ সব আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগযোগ্য হবে।
যদি নিরীক্ষা করতে বসি তাহলে আমরা দেখব একটি সুশাসিত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়া স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মের নামে হিংসা, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, এ রকম অসংখ্য সামাজিক বিষ আজ আমাদের গিলে খাচ্ছে এত বছর পরে এসেও। বিদ্বেষ আর বিভাজন সর্বত্র। 
কিন্তু নি:স্দেহে বাংলাদেশ এগিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক মতাদর্শের উত্তরসূরি তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার উপর্যুপরি তিনটি শাসনকালে একুশ শতকের বাংলাদেশ অবকাঠামোগত বড় উন্নয়নের পথে পা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হতে যাচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে সমীক্ষা পরিচালনা করেছে বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান বোস্টন কনসালটিং গ্রুপ - (বিসিজি)। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি নানাভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্রুততম প্রসরমাণ অর্থনীতির অধিকারী দেশগুলির অন্যতম। কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পাশাপাশি সঙ্গী হয়েছে বস্ত্র, মৎস্য, পাটজাত ও চর্মজ পণ্যের ন্যায় রফতানিযোগ্য শিল্পবস্তুর উৎপাদন। টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তির বিকাশও ব্যাপক। 
স্বাধীনতার মূল নিহিত রয়েছে মনোজগতে। স্বাধীনতা মানে জীবনযাপনের একটা বহিঃপ্রকাশ। কারও কাছে সেটা রাজনৈতিক হতে পারে, কারও কাছে সামাজিক, আবার কারও কাছে সেটা হতে পারে একান্ত ব্যক্তিগত একটা ব্যাপার। কিন্তু সামগ্রিকভাবে মানুষের মননের কাছে এর অর্থ হলো মুক্ত হয়ে জীবনযাপন করা। সমাজ কাঠামোর নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে নিজের মতো করে বলতে পারা চলতে পারা। বর্তমানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিসর খুব দ্রুততার সঙ্গে নিয়মিত পাল্টে যাচ্ছে। যেখানে যাদের জোর বেশি সেখানে তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। মানুষের, বিশেষ করে অতি সাধারণ মানুষের জায়গাটা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। মানুষের রাষ্ট্রে এখন মানুষই এদের ভয়ে চুপসে থাকছে।
যে মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণ দিয়েছিলেন দেশকে পরাধীনতার করাল গ্রাস থেকে বের করার জন্য, যারা এখনও বেঁচে আছেন যুদ্ধের সেই ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে, তাঁরা হয়তো কল্পনাও করেননি, এমন একটা জায়গায় এসে পড়বে প্রিয় জন্মভূমি, যেখানে মানুষ এত উপেক্ষিত থাকবে।
উদারতা, অসাম্প্রদায়িকতা, পরমতসহিষ্ণুতা, গণতন্ত্র চর্চার বাইরে যা হচ্ছে তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নয়। সেখানে কার কতটুকু দায় আছে সে খেলার চেয়ে বড় চাওয়া সামাজিক সব প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা। আমাদের বর্তমান প্রজন্ম পাকিস্তানি শোষণ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই দেখেনি। শুধু শুনেছে বা পড়েছে। তাতে মহান বিজয় দিবস বর্তমান প্রজন্মের কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে, এমন নয়। কিন্তু দিনটা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক থাকতে পারে, যদি প্রত্যেক নাগরিককে এই দিনে নতুন কোনও লড়াইয়ের দিশা দেখানো যায়। 
সাম্প্রদায়িক অন্ধকারের শক্তি জানান দিচ্ছে তাদের কতটা শক্তি সঞ্চয় হয়েছে, কতটা তাদের অগ্রগতি হয়েছে। তারা এমন এক সমাজ চায় যা আলোর চেয়ে বেশি পছন্দ করে আইএস-এর সহিংসতা বা তালেবানি উন্মাদনা। তারা জঙ্গিবাদের চর্চা করে, বিদেশি হত্যা করে, লেখক ব্লগার হত্যা করে, তারা পাঠ্যপুস্তক বদলে ফেলে। এমতাবস্থায় বড় দাবি, বড় চাওয়া, মানুষ আরও বিজ্ঞানমনস্ক হোক। কিন্তু সেটাও করতে গেলে শাসন প্রণালির ভেতর উদার-অসাম্প্রদায়িক ভাবনাটা আসা জরুরি। 
আজ আমাদের রাজনীতি চর্চায়, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় সর্বত্র সামাজিক বিষগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান থাকা জরুরি। বিজয় অর্জন করেছি, নানা কারণে সব আদর্শ ও লক্ষ্য ধরে রাখতে পারিনি। সেখানে ফিরে যাওয়ার একটা বার্তা থাকা জরুরি। নতুন নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা আরও বাড়িয়ে তোলাই এখনকার এক নতুন সংগ্রাম।
আমরা অনেক পেয়েছি। কিন্তু তবুও মনে হয় প্রাপ্তির ঝুলিটি পূর্ণ নয়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার করা দেশটির মর্মমূলে উদারপন্থা ও ধর্মের, শিক্ষা ও কুসংস্কারের দড়ি-টানাটানি এখনো অব্যাহত। মানবাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকারের প্রশ্নগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। স্মরণে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধু পশ্চিম পাকিস্তানের আগ্রাসন ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষার্থে মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়াছিলেন যখন, সেই যুদ্ধের একটি বৃহত্তর ব্যঞ্জনা ছিল। সেই আহ্বান ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সমান উদাত্ত ছিল। আমরা সবাই মিলে ধর্মীয় সন্ত্রাস রোধে যত কঠোরতা, সম্প্রীতি রক্ষায় যত তৎপরতা দেখাব, বঙ্গবন্ধুর কৃতিকে স্থায়ী প্রতিষ্ঠা দেয়া ততই সম্ভব হবে। তার মধ্যেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের গৌরব নিহিত। 

 লেখক: সাংবাদিক

জা,ই

সর্বশেষ

জনপ্রিয়