রোববার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩ , ১৫ মাঘ ১৪২৯

modhura
Aporup Bangla

মুক্তিযুদ্ধের মানুষ: স্বপ্ন ও সংগ্রাম

মতামত

ড. আতিউর রহমান

প্রকাশিত: ১৩:৩১, ১৬ ডিসেম্বর ২০২২

সর্বশেষ

মুক্তিযুদ্ধের মানুষ: স্বপ্ন ও সংগ্রাম

অলংকরণে : হাফিজ

একাত্তর বাঙালির শ্রেষ্ঠ সময়। বৈরি শক্তি ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে চলমান হাজার বছরের সংগ্রামের এক সফল পরিণতির সময়। অগণিত মানুষ-মুটে, মজুর, মাঝি, চাষি, চাকরিজীবী, ধরিক, বণিক, রাজনীতিক, ছাত্র, যুবা, বুদ্ধিজীবী, পিতা, সন্তান, জননীÑসবাই মিলে নিজেদের পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সেদিন এক হয়েছিলেন।

গড়ে তুলেছিলেন প্রতিরোধ। তাদের মনে ছিল দৃঢ় প্রত্যয়, গভীর এক স্বপ্ন এবং সংগ্রামের গৌরবময় অভিজ্ঞতা। স্বপ্ন ছিল মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার। পরিবর্তিত এক সুখী-সমৃদ্ধ নিরাপদ সমাজ গড়ার। ছিল গণতান্ত্রিক চেতনায় লালিত জীবন বিকাশের স্বপ্ন। সব ধরনের বিপর্যয় থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা। মূলত সে স্বপ্নের রূপায়ণের লক্ষ্যে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি।
স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স সিকি শতাব্দী হয়ে গেল। এত বছর পরও আমরা সুবিন্যস্ত ও বিশ্লেষণধর্মী একটি আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাস পেলাম না। ভালো হোক মন্দ হোক ভাষা আন্দোলনের ওপর এ ধরনের গবেষণা-কর্ম আমরা ইতিমধ্যে পেয়েছি। বিশেষ করে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, সে সময়ে তাদের চাওয়া-পাওয়া, স্বপ্ন ও বেদনার কথা আজও আমরা ভালোভাবে জানতে পারিনি। অবশ্য প্রয়াত হাসান হাফিজুর রহমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক দলিলসমূহ সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করে দিয়ে গেছেন। এসবের বড় অংশ ইতোমধ্যে প্রকাশিতও হয়েছে। বাদবাকি দলিল-দস্তাবেজ কোথায় কীভাবে পড়ে আছে তার খবরও আমরা রাখি না। শুনেছি জাতীয় জাদুঘরে এগুলো রয়েছে। কিন্তু ক্যাটালগ করে এগুলো গবেষকদের ব্যবহার উপযোগী করে তোলার দায়িত্ব ঐ প্রতিষ্ঠান নিয়েছে কিনা আমরা সেটা এখনো জানি না। হাসান হাফিজুর রহমান বেঁচে থাকলে হয়তো তাঁর শ্রমের-ঘামের ঐ ফসল এভাবে পড়ে থাকতে দিতেন না। নিঃসন্দেহেই তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি। একুশের সন্তান হাসান হাফিজুর রহমান একাত্তরে ঠিকই তাঁর যোগ্য ভুমিকা রেখে গেছেন। কিন্তু আমরা তাঁর অযোগ্য উত্তরসূরিরা কী করছি?
যারা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের উজ্জ্বলতম অংশকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। যারা বেঁচে আছেন তারাও যোগ্য সম্মান পাচ্ছেন না। কাক্সিক্ষত ভূমিকা রাখতে পারছেন না। তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা আজ প্রবীণ হতে যাচ্ছেন। তারা বিভক্ত, বিভ্রান্ত। অনেকেই হতাশ। সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা আজ সাধারণ্যে মিশে গেছেন। তাদের খুঁজে পাওয়ায় মুশকিল। মুক্তিযুদ্ধের কাগজপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আরও কিছুদিন পর মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাদের এবং পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন, মুক্তিযুদ্ধের কাগজপত্র এবং নথিপত্র গবেষণার জন্য খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হবে।
সেজন্য মুক্তিযুদ্ধের নানা মাত্রিকতার ওপর তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কাজে হাত দেওয়া খুবই জরুরি বলে আমাদের মনে হচ্ছে। এই তাগিদ থেকে আমরা খুব সীমিত পরিসরের একটি পাইলট সমীক্ষার কাজ সম্প্রতি শেষ করেছি বিআইডিএস থেকে। হালে সেই গবেষণার প্রাথমিক একটি প্রতিবেদন সম্পূর্ণ করেছি আমরা (দেখুন: আতিউর রহমান, ফারুক চৌধুরি ও লেনিন আজাদ : মুক্তিযুদ্ধের আর্থ-সামাজিক পরিপেক্ষিত, খসড়া, বিআইডিএস, ১৯৯৫)। সীমিত পরিসরে হলেও প্রাথমিক ও প্রকাশিত তথ্য-নির্ভর এই ধরন তাঁদের আকাক্সক্ষা ও উন্মাদনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যাবে বলে আমরা সহজেই দাবি করতে পারি। মূলত বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনার স্বরূপ উদ্ঘাটনের টানেই আমরা এই কাজটিতে হাত দিয়েছিলাম। এ কাজের মাধ্যমে আমরা সে সময়ের আর্থ-সামাজিক বেশ কিছু প্রবণতার সন্ধান পেয়েছি। কেউ ইচ্ছে করলে এসব প্রবণতা যাচাই করার লক্ষ্যে বড় মাপের গবেষণায় হাত দিতে পারেন। সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও অর্থনৈতিকÑসব ক’টি দিক নিয়েই আরও গভীর গবেষণার সুযোগ রয়ে গেছে।
আজকের এই নিবন্ধে সংক্ষিপ্ত আকারে আমাদের সদ্য-সমাপ্ত এই গবেষণাকর্মের মূল ফলাফলের সঙ্গে আমরা পাঠকদের পরিচিত করাবার চেষ্টা করবো।
অ.    বিচার্য বিষয়
আগেই বলেছি মুক্তিযুদ্ধের মানুষ ও তাদের আকাক্সক্ষা বোঝাবার লক্ষ্যেই এই গবেষণা-কর্মটি আমরা পরিচালনা করেছি। আমরা নিচের ‘হাইপোথিসিস’ বা প্রতিপাদ্য বিচার-বিশ্লেষণ করতে চেয়েছিলাম : ‘মূলত মধ্যবিত্ত থেকে উৎসারিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্ব দিলেও তাঁরা সেই আন্দোলনের এমন এক শক্ত মোজাইকের ওপর দাঁড়িয়েছিলেন যাতে কৃষক, শ্রমিক, শিল্পপতি, পেশাজীবী ইত্যাদি গোষ্ঠী ও শ্রেণির অংশগ্রহণ এবং অবদান ছিল প্রশ্নাতীত। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা একাত্তরে এক মোহনায় এসে মিলিত হতে পেরেছিল বলেই কর্তৃত্ববাদী পাকিস্তান-রাষ্ট্রের শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়েছিল।’
খ. তাত্ত্বিক কাঠামো
ওপরে বর্ণিত এই বিষয়টি প্রমাণ করার জন্য আমরা বিকাশমান একটি সমাজে মধ্যবিত্তের ঐতিহাসিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক ভূমিকা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি। সনাতন ধাঁচের মধ্যবিত্ত এবং নব্য-মধ্যবিত্তের গঠন প্রক্রিয়া, বস্তুগত বৈশিষ্ট্য, জীবন ও জীবিকার ধরন এবং সেসব বিষয়ে তাদের আশা-আকাক্সক্ষার স্বরূপ খোঁজার চেষ্টা করেছি এই তাত্ত্বিক কাঠামোর আরশিতে। এই কাঠামোতে আমরা ধরে নিয়েছি যে যদিও আলোচ্য মধ্যবিত্ত শ্রেণি শ্রমিক-কৃষক শ্রেণির সরাসরি অংশ নয়, তাহলেও তাদের জীবন ও জীবিকাতে রয়েছে সমূহ অনিশ্চিয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা। বেকারত্বের ভয়, গরিব হয়ে যাওয়ার ভয়, সামাজিক মর্যাদাহানির আশঙ্কা, চরিত্রচ্যুতির ভয়, চাকরি ও ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার ভয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা ও কর্মের সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারার ভয় মধ্যবিত্তকেও শ্রমিক ও কৃষকদের মতোই পীড়িত করে। আর সে কারণেই ইতিহাসের কোনো কোনো বাঁকে মধ্যবিত্ত ও অন্যান্য শ্রেণি একই ধরনের জাতীয় আকাক্সক্ষার কাঠামোতে ঐকতান সৃষ্টি করতে পারে। সমবেত হতে পারে এক মঞ্চে। একই লক্ষ্যে কিছুটা পথ হলেও পাশাপাশি চলতে পারে। একাত্তর ছিল তেমনি এক অতুলনীয় সময়।
গ. একটি প্রাথমিক জরিপের ফলাফল : মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রেণি অবস্থান ও আকাক্সক্ষা
মুক্তিযুদ্ধের ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিজয় মেলা আয়োজিত হয়। অন্যান্য বছরেও এ ধরনের বিজয় মেলা আয়োজিত হতো। তবে সেগুলো হতো মাত্র কয়েকটি জায়গাতেই। তখন থেকে এই উদ্যোগ বিস্তৃতিলাভ করে। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে গবেষণারত বিআইডিএস-এর গবেষকবৃন্দ সে বছর এই বিজয় মেলাগুলোতে যান এবং সেখানে সমবেত মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। তাঁরা এ কাজে একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নমালা ব্যবহার করা ছাড়াও কেস স্টাডি হিসেবে বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলাপ-আলোচনা করে তথ্য সংগ্রহ করেন। বিজয়মেলার সময় ছাড়া পরেও এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। এইভাবে গ্রহণ করা হয় মোট ১৫৯ জন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার। কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, যশোর, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহে এসব মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। এ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ ছিল একান্তই পরীক্ষামূলক। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা পরবর্তী পর্যায়ে ব্যাপক তথ্যানুসন্ধানে অবতীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছি। অঞ্চলভিত্তিক, শ্রেণিভিত্তিক, পেশাভিত্তিক প্রশ্নমালা তৈরি করে আমরা প্রতিনিধিত্বমূলক একটি জরিপ পরিচালনা করার ইচ্ছে রাখি।
যে ১৫৯ জন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়, প্রাক-মুক্তিযোদ্ধাকালে তাঁদের মধ্যে শতকরা ৭৮ ভাগের বসবাস ছিল গ্রামাঞ্চলে। বাকি ২২ ভাগ সেই সময় থাকতেন শহরাঞ্চলে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহে এই সাক্ষাৎকার নেয়া হয় প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে। যশোর ও কুমিল্লার শহর-গ্রাম উভয় এলাকাতে গিয়েই সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। চট্টগ্রামে কেবল শহর এলাকাতেই সাক্ষাৎকার গৃহীত হয়। চট্টগ্রাম শহর থেকে যে মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়, তাঁদের ৫ শতাংশের বসবাস ছিল গ্রামাঞ্চলে।
সাক্ষাৎকার প্রদানকারী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে শতকরা ৬০.৩৭ জন ছিলেন ছাত্র, ১২.৫৮ শতাংশ ছিলেন চাকরিজীবী, শতকরা ১১.৯৫ জন ছিলেন কৃষক, শতকরা ৮.১৮ জন ছিলেন ব্যবসায়ী, শতকরা ১.৮৯ জন ছিলেন শিক্ষক, বেকার জীবনযাপন করছিলেন, এমন লোক ছিলেন ১.২৬ শতাংশ। তবে ছাত্রদের বেশিরভাগই ছিলেন কৃষকসন্তান। এই বিচারে কৃষক প্রতিনিধিত্বই ছিল সর্বোচ্চ। রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন, এমন লোকজনের হার ছিল ০.৬৩ শতাংশ। উল্লেখ করতে হয় যে, যাঁরা রাজনীতি করতেন, তাঁদের প্রায় সবাই জীবিকা অর্জনের জন্য কোনো না কোনো পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন। সাক্ষাৎকার প্রদানকারী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অন্যান্য পেশাজীবীর হার ছিল ৩.১৪ শতাংশ।
গ্রাম থেকে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের তিন-চতুর্থাংশের পরিবারই ছিলেন সচ্ছল, ধনী কৃষক শ্রেণির (৭.৫+একর জমির মালিক)। এক-পঞ্চমাংশের পরিবার ছিল ক্ষুদে কৃষক শ্রেণির। তাদের দেয়া আয়ের হিসেব থেকেও বোঝা যায় তারা মধ্য ও উচ্চ আয়ের সচ্ছল পরিবার থেকে এসেছিলেন। তবে কম আয়ের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। শহর থেকে যারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, তারা বলেছেন, তাদের আয়ের বড় অংশ তখন আসতো কৃষি থেকে। মূলত ব্যবসা থেকে আয় আসতো এমন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সংখ্যা ছিল ২৫ ভাগ।
শিক্ষিত পিতার সন্তানরাই মূলত মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। শতকরা ৮৫% উত্তরদাতা এ কথা বলেছেন। মুক্তিযোদ্ধারা খুবই রাজনীতি-সচেতন ছিলেন। উত্তরদাতাদের ৭৮% রাজনীতি করতেন। তাদের সিংহভাগ (৬২%) আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দুই ন্যাপ থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের অংশভাগ ছিল ৭%। বাদবাকিরা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও রাজনীতি-সচেতন ছিলেন।
আমাদের নির্দিষ্ট প্রশ্নমালায় একটি জিজ্ঞাসা ছিল এমন : ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের ঠিক আগে দেশের রাজনীতি নিয়ে কী চিন্তা করতেন?  এই প্রশ্নের জবাব দেন ১৫৫ জন মুক্তিযোদ্ধা। এদের মধ্যে ৯৭ জন বা ৬২.৫৮ শতাংশ বলেন যে, তাঁরা তখন স্বাধীনতা চাইতেন এবং শতকরা ৮.৩৯ জন চাইতেন স্বায়ত্তশাসন। উত্তরদাতাদের মধ্যে ১৯.৩৫ শতাংশ বলেন যে, তারা স্বায়ত্তশাসন চাইতেন, তবে এর পরিণতিতে পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাক সেটা চাইতেন না। এদের মধ্যে ৩.২৩ জন গণতন্ত্র চাইতেন। ২৫ মার্চের ঠিক আগে সুনির্দিষ্ট কোনো ভাবনা ছিল না এমন উত্তর উত্তরদাতার হার হচ্ছে শতকরা ৪.৫২ ভাগ।
২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের মতামত আরও পরিবর্তিত হয়। ২৫শে মার্চের ঠিক আগে যারা স্বায়ত্তশাসন চাইতেন, তারা মতামত পাল্টে স্বাধীনতার পক্ষে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। একইভাবে অন্যদের মতামতও পরিবর্তিত হয়। তখন আর মতপার্থক্য থাকে না। প্রত্যেকে সিদ্ধান্ত নেন দেশ স্বাধীন করার।
শিক্ষকতা যোগ্যতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায় যে, এই ১৫৯ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে নিরক্ষর ছিলেন মাত্র ১ জন। অর্থাৎ এই হার ০.৬৩ শতাংশ। সাক্ষর ও পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন, এরকম লোকজনের হার শতকরা ১২ ভাগ। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন, এরকম লোকজনের হার  ২৭.০৪ শতাংশ। এসএসসি এবং এইচএসসি পাশ করেছেন, এমন লোকের হার ছিল যথাক্রমে ১৪.৪৭ ও ১৯.৫০ শতাংশ। বি.এ পাশ করেছেন, এরকম লোকের হার ছিল ২৮.৩০ শতাংশ। এম.এ পাশ করেছেন, এরকম লোকজনের হার ছিল ৩.১৪ শতাংশ। অর্থাৎ শতকরা পয়ষট্টি ভাগই ছিলেন এস.এস.সি এবং তার চাইতে ওপরের ডিগ্রিধারী।
মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে জানতে হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয় তাঁদের উৎসাহ করেছিল। এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ১৫১ জন। এঁদের মধ্যে ১৪৯ জন, অর্থাৎ প্রায় ৯৪ শতাংশ বলেছেন, স্বাধীন মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষায় তাঁদেরকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে প্রাণিত করেছিল। শতকরা ৯১ জনের আশঙ্কা ছিল শোষণহীণ সমাজ প্রতিষ্ঠা। উত্তরদাতাদের মধ্যে শতকরা ৮০ জনের কাছে সর্ব প্রথম কাম্য ছিল আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকবার আকাক্সক্ষা। ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা জানান যে, অন্যান্য আকাক্সক্ষা, অন্যান্য স্বাধীন মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠা, শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা ছাড়াও সমৃদ্ধ দেশ গঠনের আকাক্সক্ষা তাঁদেরকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে উৎসাহিত করেছিল। উত্তর প্রদানকারী ৭২ জন মুক্তিযোদ্ধা বলেন যে, উল্লিখিত অন্যান্য আকাক্সক্ষা ছাড়াও কায়েমি স্বার্থবাদীদের প্রতিহত করার লক্ষ্যও তাঁদের ছিল।

(চলবে)
 

জা,ই

সর্বশেষ

জনপ্রিয়