বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

Aporup Bangla

স্পোর্টস পলিটিকার বিশ্লেষণ

দুই ১০, দুই পথ: ট্রাম্প-মিলেইয়ের রাজনৈতিক ‘সফট পাওয়ার’ মেসি!

খেলাধুলা

অপরুপ বাংলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯:৪১, ১৮ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ

দুই ১০, দুই পথ: ট্রাম্প-মিলেইয়ের রাজনৈতিক ‘সফট পাওয়ার’ মেসি!

ছবি : সংগ্রহ

মিশরীয় বংশোদ্ভূত বিশ্বখ্যাত ক্রীড়া এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিক করিম জিদানের মিডিয়া ভেঞ্চার ‘স্পোর্টস পলিটিকা’-এর একটি বিশেষ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে কীভাবে খেলাধুলা ও রাজনীতি বিশ্বকে প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি লিওনেল মেসিকে কেন্দ্র করে ভূরাজনীতি, কট্টরপন্থী রাষ্ট্রপ্রধানদের সমীকরণ এবং নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ফুটবল বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে।


২০২৬ বিশ্বকাপের শুরুতে আর্জেন্টিনার কাছে আলজেরিয়ার ৩-০ গোলে হেরে যাওয়ার পর আলজেরিয়ার এক ক্রীড়া বিশ্লেষক মুস্তফা মাজুজি সরাসরি ‘ইহুদি লবি’ বা জায়নিস্টদের দিকে আঙুল তোলেন। মেসিকে একটি ফাউলের জন্য লাল কার্ড না দেওয়ায় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ও রেফারিকে দায়ী করে মাজুজি বলেন, ‘এই লবি পুরো বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে, মাফিয়ার মতো তারা যেভাবে খুশি বিশ্ব চালায়।


’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘ওয়েস্টার্ন সাহারা এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে আমাদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই তারা আমাদের ভালো দেখতে চায় না।’
আর্জেন্টিনা যতই টুর্নামেন্টে এগিয়েছে, এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ততই ডালপালা মেলেছে।

শেষ ১৬-এর ম্যাচে মিশরের একটি গোল বাতিল হওয়া ও ভিএআর বিতর্কের পর আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলের জয় কিংবা কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত; সবকিছুতেই ‘জায়নিস্ট ষড়যন্ত্র’ খুঁজেছেন সমালোচকরা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন ও এর সভাপতির বিরুদ্ধে এফবিআই-এর অর্থ পাচারের তদন্ত।
সমালোচকদের একাংশ দাবি করেন মেসি নিজেই একজন জায়নিস্ট, যার প্রমাণ হিসেবে তার সঙ্গে ইসরায়েলের পুরোনো সম্পর্কের কথা টানা হয়।
২০১৩ সালের জুলাই মাসে বার্সেলোনার হয়ে মেসি ইসরায়েল সফর করেন। সেখানে তিনি ইহুদিদের পবিত্র স্থান ‘ওয়েস্টার্ন ওয়াল’ পরিদর্শন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ছবি তোলেন। অবশ্য ২০১৮ সালে ফিলিস্তিনের ‘বিডিএস’ আন্দোলনের চাপে ইসরায়েলের সঙ্গে একটি প্রীতি ম্যাচ বাতিল করেছিল আর্জেন্টিনা। তখন ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জিবরিল রাজৌব মেসিদের জার্সি পোড়ানোর ডাক দেওয়ায় ফিফা কর্তৃক এক বছর নিষিদ্ধ হয়েছিলেন।

পরবর্তীতে ২০১৯ এবং ২০২২ সালে মেসি ইসরায়েলের মাটিতে ম্যাচ খেলেছেন এবং একটি ইসরায়েলি এআই প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও কাজ করেছেন। তবে তিনি নিজে কখনো ইসরায়েলের পক্ষে বা জায়নিজমের সমর্থনে কোনো বক্তব্য দেননি। কিন্তু ফিলিস্তিনের তিনটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে (২০০৮-০৯, ২০১২, ২০১৪) যখন ২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হন, সেই সময়ে ইসরায়েল সফরের মাধ্যমে মেসি নিজের ইমেজকে একটি রাষ্ট্রের ‘সফট পাওয়ার’ বা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছেন; এমনটাই অভিযোগ সমালোচকদের। আর্জেন্টাইন অধ্যাপক পাবলো আলাবারসেস অবশ্য মনে করেন, ‘মেসির কোনো রাজনৈতিক মতামত নেই।’

মুখ ফুটে কিছু না বললেও মেসি নিজের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডকে স্বৈরাচারী ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে দিয়েছেন, যার বড় উদাহরণ সৌদি আরব। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয় যে, ২০২১ সালে সৌদি পর্যটন কর্তৃপক্ষের সাথে ৩ বছরের জন্য ২৫ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেন মেসি। চুক্তির একটি শর্ত ছিল, মেসি এমন কিছু বলতে পারবেন না যা সৌদির ভাবমূর্তি ‘ক্ষুণ্ণ’ করে।

মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার দায়ে অভিযুক্ত সৌদির প্রচারণায় অংশ নিতে মেসি তার পরিবারসহ জেদ্দায় ছুটি কাটিয়েছেন এবং ঘোড়া পরিচর্যা বা ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার প্রচারণামূলক ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। ২০২২ সালে ১২২ মিলিয়ন ডলার আয় করা মেসির এই অর্থের কোনো প্রয়োজন ছিল না, তবে এটি ছিল একটি স্বৈরাচারী শাসনের সঙ্গে নিজের ব্র্যান্ডকে জুড়ে দেওয়ার সচেতন সিদ্ধান্ত।

২০২৩ সালে ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপসকে হারিয়ে সম্প্রতি মেজর লিগ সকারের  শিরোপা জিতেন মেসি। এই সাফল্যের পর হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেয় মায়ামি দল।

সেখানে মেসি মঞ্চে নীরব থাকলেও ট্রাম্প তার বক্তব্যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুঙ্কার ছেড়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আমাদের চমৎকার ইসরায়েলি অংশীদারদের সঙ্গে মিলে শত্রুকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে চলেছে, যা মানুষের কল্পনারও বাইরে।’ ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক বক্তব্যের পর মেসি ও তার সতীর্থদের হাততালি দিতে দেখা যায়।

লাতিন আমেরিকার সাবেক কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা যেখানে বামপন্থী রাজনীতির স্পষ্ট প্রবক্তা ছিলেন, মেসি সেখানে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার পথ বেছে নিয়েছেন। সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির এক জরিপে দেখা গেছে, উদারপন্থী বা লিবারেল ভাবধারার মানুষ মেসিকে এবং রক্ষণশীল বা কনজারভেটিভরা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে পছন্দ করেন।

মেসির এই নীরবতা ও তথাকথিত নিরপেক্ষতাকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন আর্জেন্টিনার কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। ট্রাম্পের মঞ্চে মেসির হাততালি দেওয়া নিয়ে যখন সমালোচনা তুঙ্গে, তখন নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে মিলেই হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, ‘যদি কেউ মেসির ওপর চড়াও হতে চায়, তবে সে আমাদের সবার বিরুদ্ধেই চড়াও হচ্ছে।’ মিলেই নিজে অনেকবার ইসরায়েলের পক্ষে সরব হয়েছেন। তার হাত ধরে ফিলিস্তিন-পন্থী আর্জেন্টিনা সরকার এখন ইসরায়েলের পক্ষপাতিত্ব করছে প্রকাশ্যেই। কিছুদিন আগে মিলেইয়ের জন্য বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। 

ম.র

Bijoy

সর্বশেষ

জনপ্রিয়