ফাইল ছবি
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক অভিযানে টানা ২৮৬ দিন সমুদ্রে থাকা বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বাধীন স্ট্রাইক গ্রুপে মোট আটটি আত্মহত্যার চেষ্টা হয়েছে। তবে এসব ঘটনায় কতজন ব্যক্তি জড়িত ছিলেন, তা স্পষ্ট করেনি মার্কিন নৌবাহিনী।
মোতায়েনের সময় কোনো আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেনি বলেও জানিয়েছে তারা।
মার্কিন সিনেটর কার্স্টেন গিলিব্র্যান্ডের প্রশ্নের জবাবে ভারপ্রাপ্ত নৌমন্ত্রী হাং কাও গত মঙ্গলবার দেওয়া এক চিঠিতে এ তথ্য জানান।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের পক্ষে দেওয়া ওই জবাবে আব্রাহাম লিংকন স্ট্রাইক গ্রুপের সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রার পরিবেশ ও মনোবল নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়।
হাং কাও জানান, লিংকনের মোতায়েন শুরুর পর স্ট্রাইক গ্রুপজুড়ে মোট আটটি আত্মহত্যার চেষ্টা হয়েছে।
এর মধ্যে শুধু রণতরিটির নাবিকরা নন, ক্যারিয়ার এয়ার উইং, স্ট্রাইক গ্রুপ ও ডেস্ট্রয়ার স্কোয়াড্রনের সদস্য, রণতরিটিকে পাহারা দেওয়া ডেস্ট্রয়ার এবং সঙ্গে থাকা বিভিন্ন বিমান স্কোয়াড্রনের সদস্যরাও রয়েছেন।
এর মধ্যে দুটি ঘটনার বিস্তারিতও জানানো হয়েছে।
গত মার্চে এক নাবিক রণতরি থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করলে সহকর্মীরা তাকে আটকে দেন। পরে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং নিজ ঘাঁটিতে ফেরত পাঠানো হয়। আগস্টে বিমান শাখার আরেক নাবিক রণতরি থেকে সমুদ্রে পড়ে যান। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরবর্তী চিকিৎসার জন্য জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন গত বছরের নভেম্বরে সমুদ্রে যাত্রা শুরু করে। দীর্ঘ এই মোতায়েনের মধ্যে রণতরিটি টানা ২৮৬ দিন সমুদ্রে ছিল। গত ১ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডে গিয়ে নাবিকরা জাহাজ থেকে নামার সুযোগ পান। এর আগে ডিসেম্বর মাসে অল্প সময়ের জন্য একটি বন্দরে থামা ছাড়া দীর্ঘ সময় তারা স্থলে নামার সুযোগ পাননি।
দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থানের কারণে রণতরিটিতে নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোবল নিয়ে আগেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সামরিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে নাবিকদের মানসিক চাপ, ক্লান্তি এবং আত্মহত্যার চিন্তার কথা উঠে আসে। কয়েকজন নাবিকের জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টার কথাও তখন প্রকাশ্যে আসে।
এসব প্রতিবেদনের পর রণতরিটির পরিস্থিতি নিয়ে তদন্তের দাবি জানান ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতারা। সিনেটর গিলিব্র্যান্ডও নাবিকদের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিয়ে প্রশাসনের কাছে বিস্তারিত জানতে চান।
লিংকনের জীবনযাত্রার পরিবেশ নিয়েও নানা অভিযোগ সামনে আসে। রণতরিটিতে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি, গোসলখানায় ছত্রাক এবং পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নিয়ে সমস্যার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
তবে হাং কাও এসব অভিযোগের জবাবে জানান, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরবরাহের সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ায় কিছু সময় খাবারের প্রধান দুটি পদের পরিবর্তে একটি পদ পরিবেশন করা হয়েছিল। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, নাবিকদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী, তাজা খাবার ও গুরুত্বপূর্ণ মেরামতের যন্ত্রাংশ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
জাহাজটিতে একপর্যায়ে পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিয়েছিল বলেও স্বীকার করেন কাও। পরে প্রকৌশলীরা তা মেরামত করেন এবং জাহাজের পানির সরবরাহ নিরাপদ ও নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
নাবিকদের মানসিক সহায়তার জন্য রণতরিটিতে একজন মনোবিজ্ঞানী, একজন ক্লিনিক্যাল সমাজকর্মী, তিনজন আচরণগত স্বাস্থ্যকর্মী, একজন পরামর্শক, পাঁচজন ধর্মীয় সহায়তাকারী এবং একটি প্রশিক্ষিত সহায়ক কুকুর রাখা হয়েছিল বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ রণতরিটির নাবিকদের মনোবল ও জীবনযাত্রার অবস্থা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে অতিরঞ্জিত বলে দাবি করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও রণতরিটির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনকে ভুয়া খবর বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
তবে আটটি আত্মহত্যার চেষ্টার তথ্য প্রকাশের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। সিনেটর গিলিব্র্যান্ড বলেছেন, যেসব প্রতিবেদনকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘ভুয়া খবর’ বলা হয়েছিল, সেসব প্রতিবেদনে মার্কিন সেনাসদস্যদের গুরুতর ও অবনতিশীল পরিস্থিতির বিষয়টি উঠে এসেছিল।
অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নাবিকদের স্বাস্থ্য, কল্যাণ ও মনোবলের বিষয়টি নৌবাহিনী এবং নৌমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, সিবিএস নিউজ
ম.র





