ছবি : প্রতিনিধি
রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। একইসঙ্গে ঘটনা তদন্তে মাঠে নেমেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বোম ডিসপোজাল ইউনিট।
বৃহস্পতিবার (২৭ মে) সকালে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে গিয়ে বিভিন্ন আলামত ও নমুনা সংগ্রহ করে। প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী তারা ঘটনাস্থলে কাজ করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিমের এক সদস্য জানান, সব ধরনের সম্ভাবনা মাথায় রেখেই নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই নিষ্পাপ শিশুদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা করা হবে।
একইদিন ডিএমপির বোম ডিসপোজাল ইউনিটের একটি দলও হাসপাতালে আসে। উন্নত প্রযুক্তির বিশেষ ডিভাইস দিয়ে তারা ওই কক্ষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছে সেখানে কোনো বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল কিনা।
ইউনিটের এক সদস্য বলেন, সিনিয়র কর্মকর্তাদের নির্দেশে তারা এসেছেন এবং তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।
এ বিষয়ে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত ছয় শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল নমুনা সংগ্রহ করছে, তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ জানা যাবে।
ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, আরও পাঁচ শিশু হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি রয়েছে এবং তাদের চিকিৎসা চলছে। যদিও তাদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসাধীন কয়েকটি শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং তাদের শরীর নীলচে বর্ণ ধারণ করেছে।
এদিকে স্বজনদের অভিযোগ, পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ থাকায় এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় নবজাতকদের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তাদের দাবি, মঙ্গলবার (২৬ মে) রাত থেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নানা অজুহাতে নবজাতকদের দেখতে দিচ্ছিল না এবং পোস্ট অপারেটিভ রুমে প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছিল।
কেরানীগঞ্জের নাদিম জানান, তার তিন দিন বয়সী ভাতিজাও মারা গেছে এই ঘটনায়। তিনি বলেন, রাত থেকেই কাউকে ভেতরে যেতে দেওয়া হচ্ছিল না। নার্সরা বলেছিলেন এসিতে সমস্যা হয়েছে। সকালে একে একে শিশুদের বের করে আনা হয়। কেউ বমি করছিল, কারও শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ভাতিজা মারা যায়।
পোস্ট অপারেটিভ রুমের সামনে বসেছিলেন শারমিন আক্তার। তার কোলে ভাইয়ের একদিন বয়সী ছেলের নিথর দেহ। পাশে বসা শিশুটির মা আগের দিনই সিজারিয়ান অপারেশন করিয়েছেন। নিজের সন্তানের লাশ কোলে নেওয়ার শক্তিও ছিল না তার।
শারমিন বলেন, শিশুটি আগের দিনও সুস্থ ছিল। তার মা ভেতরে গিয়ে দেখেছিলেন, এসি বন্ধ থাকায় রুমের পরিবেশ দমবন্ধ করা। কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তারা গুরুত্ব দেয়নি। সকালে শিশুটি বমি শুরু করে এবং পরে মারা যায়।
আরও কয়েকজন স্বজন অভিযোগ করেন, পোস্ট অপারেটিভ ফ্লোরে পুরুষ স্বজনদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ভেতরে থাকা স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না এবং পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর।
আবু বক্কর নামে এক স্বজন জানান, তার বোনের মেয়েকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, রাত থেকে কাউকে শিশুদের দেখতে দেওয়া হয়নি। ব্যবস্থাপনা ছিল খুবই খারাপ। অনেক শিশুকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সরিয়ে নেওয়া হলেও স্বজনদের কিছু জানানো হয়নি।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ঘটনাটি ঘটেছে তাদের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে, যেখানে ১১ জন মা ও ছয় নবজাতক ছিল।
হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ড. নাহিদা ইয়াসমিন বলেন, এটি এসি ওয়ার্ড হওয়ায় রাতের দিকে মায়েরা ঠান্ডা লাগার অভিযোগ করেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সদের এসি বন্ধ করতে বলেন। রাত ৩টার দিকে দুই শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে তাদের আবার ওয়ার্ডে পাঠানোর পরামর্শ দেন। পরে সকাল ৬টার দিকে আরও কয়েকজন মা শিশুদের অসুস্থতার কথা জানালে ছয় শিশুকেই এনআইসিইউতে নেওয়া হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই শিশু এনআইসিইউতে নেওয়ার পথেই মারা যায়। বাকি চারজনকে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কাউকেই বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর পুরো হাসপাতালজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। মাতৃত্বের আনন্দ পাওয়ার আগেই সন্তানের লাশ বুকে নিয়ে আহাজারি করছেন মায়েরা। সদ্যোজাত শিশুদের রহস্যজনক এই মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। এখন সবার অপেক্ষা সিআইডির ফরেনসিক তদন্ত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকে।
ম.র





