ফাইল ছবি
গুমকালীন ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবেগঘন ও বীভৎস অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী। তিনি জানান, ছারপোকার কামড়ে শরীর ও পোশাক রক্তাক্ত হয়ে যেত। নামাজ আদায়ের জন্য আলাদা লুঙ্গি না পেয়ে বাধ্য হয়ে রক্তমাখা কাপড়েই ইবাদত করতে হতো।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ সাক্ষ্য দেন আযমী। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ঘুমানোর জন্য যে তোষক দেওয়া হয়েছিল, তাতে শত শত ছারপোকা ছিল। কামড়ে তার শরীর ও কাপড় রক্তে ভিজে যেত। নামাজের জন্য আলাদা লুঙ্গি চাইলে তা দেওয়া হয়নি। আগে যে লুঙ্গিটি দেওয়া হয়েছিল, সেটি ছিল নিম্নমানের এবং দীর্ঘ ব্যবহারে ছিঁড়ে যায়। ছেঁড়া জায়গা সেলাই করতে করতে দর্জিও বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। পরে নিজেই সুঁই-সুতা চাইলে সেটিও দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত ছেঁড়া জায়গায় গিট্টু দিয়ে লুঙ্গি ব্যবহার করতে বাধ্য হন তিনি।
আযমী জানান, অপহরণের এক মাস পর ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা ৫০ মিনিটে এক কর্মকর্তা তাকে জানান, একটি সম্ভাব্য অঘটনের আশঙ্কায় তাকে আটক রাখা হয়েছিল এবং এখন সে শঙ্কা কেটে গেছে। মুক্তির সময় সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসতে হবে।
এরপর ১৯ অক্টোবর প্রথমবার এবং একই বছরের ২২ অক্টোবর ও ৭ ডিসেম্বর আরও দুবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে মূলত বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে তার সম্পর্ক, পরিচিতি এবং বিশেষভাবে জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন করা হতো বলে জানান তিনি। ভারতের বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখির বিষয়েও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
আযমী ট্রাইব্যুনালে বলেন, জামায়াতের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই—এ কথা বারবার বলার পরও তাকে চাপ দেওয়া হতো স্বীকার করতে যে, তিনি নাকি জামায়াতের আমির হতে যাচ্ছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তার বাবা জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আমির হলেও ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই।
ভারতবিরোধী লেখালেখি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করেন, এটি যদি অপরাধ হয়, তবে কেন তাকে আদালতে সোপর্দ না করে অবৈধভাবে আটক রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সেনাবাহিনীতে ৩০ বছরের চাকরিতে ভারতকে প্রধান শত্রু হিসেবেই শেখানো হয়েছে। এটি যদি অপরাধ হয়, তবে সেই শিক্ষা দেওয়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অপরাধী।
একপর্যায়ে তাকে বলা হয়, তদন্ত চলমান থাকায় তাকে আটক রাখা হয়েছে। এর জবাবে তিনি প্রশ্ন করেন, কোনো ঘটনা না ঘটলে কীসের তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, এ ধরনের তদন্ত কেয়ামত পর্যন্ত শেষ হবে না—এ কথা বলায় কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
সাক্ষ্যের একপর্যায়ে আযমী জানতে চান, তাকে হত্যা করা হবে কি না। জবাবে কর্মকর্তারা বলেন, হত্যা করতে চাইলে অনেক আগেই তা করা যেত।
ট্রাইব্যুনালে তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে টানা দুই দিন জবানবন্দি দেন আযমী। প্রথম দিনে গুমের ঘটনা ও বরখাস্তের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং দ্বিতীয় দিনে অবশিষ্ট জবানবন্দি শেষে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করেন। তার জেরার জন্য আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আদালত।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট গুমের শিকার হন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী। দীর্ঘ আট বছর পর ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট তিনি মুক্তি পান। ২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বরের পর তাকে আর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি বলেও জবানবন্দিতে জানান তিনি।
ম.র





