সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু/ফিইল ছবি
‘হাসানুল হক ইনু শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছেন, ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করেছেন এবং এই ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতিতে জুলাইয়ে হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে—এটা ট্রাইব্যুনাল বলেছেন। কিন্তু সাজা প্রদানের ক্ষেত্রে তাকে যখন ১০ বছর সাজা দিয়েছেন, তখন আমরা বলেছি যে ট্রাইব্যুনালের অবজারভেশনের থেকে সেন্টেন্সিংটা—এটা কন্ট্রাডিক্টরি হয়েছে।
এই কারণে আমরা আপিল করেছি।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম প্রধান শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের এমন তথ্য জানিয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম।
সোমবার (৫ অক্টোবর) প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম বলেন, হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করেছে প্রসিকিউশন।তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনাল তার (হাসানুল হক ইনু) বিরুদ্ধে যে সাজা দিয়েছিলেন, সেই সাজাকে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে অপর্যাপ্ত সাজা মনে করেছি।যার কারণে আমরা এই আপিলটি দায়ের করেছি। এই আপিলে আমরা ১১টি যুক্তি দিয়েছি।
এই ১১টি যুক্তির ভিত্তিতে আমরা আবেদন করেছি যে, তাকে যেন এই ১০ বছরের সাজা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি—এই আইনের অধীনে যা আছে, সেটি দেওয়া হয়। কয়েকটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে, সেই অভিযোগগুলোতেও আমরা সর্বোচ্চ শাস্তির প্রার্থনা করেছি।’
এম এইচ তামীম আরও বলেন, ‘যুক্তিতে বলেছি যে, একটি আদালতের কোনো মামলায় শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে ন্যাশনাল এবং ইন্টারন্যাশনাল জুরিসপ্রুডেন্স হলো যে, গ্র্যাভিটি অব দ্য অফেন্স দেখতে হয়, এই অপরাধের ভয়াবহতা, গভীরতা কতখানি। স্কেল অব দ্য অ্যাটাক। অর্থাৎ, কী পরিমাণ মানুষের ওপর এই হত্যাযজ্ঞ পরিচালিত হয়েছে, কী পরিমাণ মানুষ নিহত হয়েছে, আহত হয়েছে। একই সঙ্গে আরেকটি জিনিস আমরা দেখিয়েছি, সেটা হলো একটি সোসাইটির এক্সপেক্টেশনটা কী। সোসাইটির ক্রাইটেরিয়া কোন লেভেলের এই অপরাধের ক্ষেত্রে, সেটা আমরা দেখিয়েছি যে, সেটা ট্রাইব্যুনালের রায়ে প্রস্ফুটিত হয়নি।’
‘এমনকি আমরা এটা দেখিয়েছি যে, ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে যেসব অবজারভেশন দিয়েছেন, হাসানুল হক ইনু শেখ হাসিনার সঙ্গে কথোপকথন করেছেন। কীভাবে আন্দোলন দমন করা যায়, কারফিউ জারি করে ষড়যন্ত্র করেছেন, কারফিউ জারি করে হত্যা এবং তাদের গ্রেপ্তারের পরামর্শ দিয়েছেন—এসব বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল অবজার্ভ করেছেন। ট্রাইব্যুনাল বলেছেন যে হ্যাঁ, এগুলো সত্য। হাসানুল হক ইনু এই কাজগুলো করেছেন, তিনি শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছেন, ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করেছেন এবং এই ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতিতে জুলাইয়ে হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে, এটা ট্রাইব্যুনাল বলেছে। কিন্তু সাজা প্রদানের ক্ষেত্রে তাকে যখন ১০ বছর সাজা দিয়েছেন, তখন আমরা বলেছি যে ট্রাইব্যুনালের অবজারভেশনের থেকে সেন্টেন্সিংটা, এটা কন্ট্রাডিক্টরি হয়েছে। এই কারণে আমরা আপিল করেছি।’
এই প্রসিকিউটর আরও বলেন, ‘ইন্টারন্যাশনাল জুরিসপ্রুডেন্স দেখিয়েছি। আমরা বলেছি যে একজন সিভিলিয়ান সুপিরিয়র কমান্ডার, লাইক ইনু—তার অর্ডার, তার সাবঅর্ডিনেট, তার অ্যাক্টিভিস্টদের কাছে একজন আর্মি কমান্ডারের অর্ডারের চেয়েও বেশি। একজন আর্মি কমান্ডার যখন তার সাবঅর্ডিনেটকে অর্ডার করেন, তখন দেখা যায় যে তার সাবঅর্ডিনেটরা সেটা মানেন অথবা নাও মানতে পারেন। কিন্তু একজন সিভিলিয়ান সুপিরিয়র লিডার যখন তার অধীনস্থদের অর্ডার করেন, তখন শুধু এটা অর্ডার থাকে না—সেখানে অপরাধ সংগঠনের একটা শেপ তৈরি করা হয়, একটা এনভায়রনমেন্ট তৈরি করা হয়।’
‘কারণ আর্মি কমান্ডার জাস্ট অর্ডারটাই দেন। আর একজন সিভিলিয়ান লিডার এই অর্ডারের সঙ্গে একটা বক্তৃতা দেন, একটা ইন্সটিগেটিং বক্তব্য দেন। যারা তার সাবঅর্ডিনেট, তারা সেটা ফলো করে, একটা অপরাধ সংগঠনের এনভায়রনমেন্ট ক্রিয়েট করে। এখানে ব্যাখ্যা করে লাস্টলি প্রার্থনা করেছি যে, এই আপিলটা যেন গ্রহণ করা হয় এবং এই আপিলের ভিত্তিতে এই আসামি হাসানুল হক ইনুকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং হায়েস্ট কমপেনসেশনটা যেন প্রদান করা হয়।’
এর আগে ৫ জুন মঙ্গলবার এ রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রায়ে তিন অভিযোগে ১০ বছর করে ৩০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আটটি অভিযোগে আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি, ১৪ দলীয় জোট সরকারের অংশীদার জাসদের সভাপতি হিসেবে তার ঊর্ধ্বতন অবস্থান থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নির্দেশনা, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা এবং কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলন দমনের নির্দেশনার পর ছয়জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
ম.র





