মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ , ১১ কার্তিক ১৪৩৩

Aporup Bangla

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কে নতুন দিগন্ত, জ্বালানি ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ

জাতীয়

অপরূপ বাংলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২:১৭, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১৮:৪০, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কে নতুন দিগন্ত, জ্বালানি ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ

ফাইল ছবি

ঢাকা: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা ও অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও দুই নেতা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের লক্ষ্য বাস্তবায়নে জাপান সরকার এবং দেশটির বেসরকারি খাতের আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ কামনা করেন। তিনি বাংলাদেশকে আঞ্চলিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বাংলাদেশের মানুষের কাছে জাপানের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি জাপান। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা, শান্তি ও সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতেই দুই দেশের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

এ সময় তিনি তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুইবার জাপান সফর এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক উন্নয়নে অবদানের কথা স্মরণ করেন। অতীতের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

 জ্বালানি নিরাপত্তায় জাপানের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নিরবচ্ছিন্ন, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এ ক্ষেত্রে জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি এশিয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় সাম্প্রতিক ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের বিষয়টি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। দুই দেশের অংশীদারত্বের মাধ্যমে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।

 এআই ও মহাকাশ গবেষণায় যৌথ উদ্যোগের প্রস্তাব

প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মাধ্যমে জাপানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তা এবং দক্ষ জনশক্তির সংযোগ তৈরির ওপর জোর দেন তিনি।

প্রস্তাবিত টেক পার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনের মতো সম্ভাবনাময় খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

এ ছাড়া মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে জাপানের উন্নত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। এর মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতে জ্ঞান বিনিময়, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে বলে আলোচনায় উঠে আসে।

 দ্রুতগতির রেল ও অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের সহায়তা কামনা

দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম গতিশীল করতে আধুনিক ও সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশব্যাপী উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিকল্পনা প্রণয়ন, কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে জাপানের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী। আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সংস্কারের অঙ্গীকার

বাংলাদেশে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে তাঁর সরকার বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, করনীতি, শুল্ক ছাড়করণ এবং অর্থ স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে কাজ করছে।

নীতিমালার পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম সহজ করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত কার্যকর করার প্রত্যাশা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, চুক্তিটির সুফল দুই দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে উভয় পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 জাতিসংঘ ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা বাড়ানোর তাগিদ

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুপাক্ষিকতা, শান্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার বিষয়ে দুই দেশের অভিন্ন অবস্থানের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচনে জাপানের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারেও জাপানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশা জানান।

একটি অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী আঞ্চলিক যোগাযোগ, বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।

 রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাপানের সক্রিয় ভূমিকা চায় বাংলাদেশ

মিয়ানমারের অবনতিশীল পরিস্থিতি এবং এর ফলে সৃষ্ট রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতি সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ, বাধাহীন মানবিক সহায়তা নিশ্চিত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সহায়তায় জাপানের ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। একই সঙ্গে রাখাইনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে জাপানের সক্রিয় সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত। এ জনগোষ্ঠীর স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব, সম্পর্ক গভীর করার প্রত্যয়

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও গতিশীল করতে অগ্রাধিকারভিত্তিক খাত চিহ্নিত করার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এসব খাতে গৃহীত উদ্যোগের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত এবং সহযোগিতার সম্ভাবনাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।

দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, সরকারি পর্যায়ের উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করতে পারে।

বৈঠকের আলোচনা দুই দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের অভিন্ন লক্ষ্যকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। এ সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।

পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও জাপানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গভীর ও বিস্তৃত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

ম.র

সর্বশেষ