মঙ্গলবার, ২৯ নভেম্বর ২০২২ , ১৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

modhura
Aporup Bangla

৭ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস

মতামত

মিল্টন বিশ্বাস

প্রকাশিত: ০৯:৫৬, ৭ নভেম্বর ২০২২

সর্বশেষ

৭ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস

ছবি/ সংগ্রহ

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরকে বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এদিন জিয়াউর রহমানের সঙ্গীরা খালেদ মোশাররফসহ আরও অনেককে হত্যা করেছিল। অথচ দেশপ্রেমিক খালেদ মোশাররফ বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে জড়িতদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। সেদিন জিয়াউর রহমান গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে আর যা করেছিলেন তা এদেশকে নয়া পাকিস্তানে পরিণত করেছিল। বিশেষত বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর খুনি মোশতাক ও জিয়ার নেতৃত্বে জাতীয় চার নেতাকে জেলের ভেতর হত্যা এবং ১৯৮১ সাল অবধি কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে বিচারের নামে প্রহসন করে নিষ্ঠুরভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কিংবা গুলি ও গুম করে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসকে করা হয় কলঙ্কিত।

সেদিনকার সিপাহীদের চেহারা ও আচরণ নিয়ে কর্নেল শাফায়াত জামিল রচিত ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর’ শীর্ষক বইতে লেখা হয়েছে- ‘সিপাহী বিদ্রোহে অংশ নেওয়া সিপাহীরা ছিল পাকিস্তান প্রত্যাগত এবং তারা কেউই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কোনো ব্যাটালিয়নে ছিল না। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে ষড়যন্ত্র এবং জঘন্য হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার জন্যই বিশেষ মহল ৭ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। আর বিশেষ মহলের নেপথ্যে কারা ছিল তা জাতির নিকট অত্যন্ত স্পষ্ট।’

 ‘৭ নভেম্বর প্রথম প্রকাশ্যে হত্যার শিকার হন দুজন সেক্টর কমান্ডার ও একজন সাব-সেক্টর কমান্ডার। আর এই ৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে ২১ জুলাই ১৯৭৬ সালে ফাঁসিতে মৃত্যুবরণ করেন আরেক সেক্টর কমান্ডার। এছাড়া সেনাবাহিনীর ভেতরে ১৩ জন হত্যার শিকার হন। স্বাধীনতা যুদ্ধেও কোনো সেক্টর কমান্ডারকে প্রাণ হারাতে হয়নি।’ 

৭ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা নিয়ে জনৈক গবেষকের মন্তব্য হলো- ‘৭ নভেম্বর প্রথম প্রকাশ্যে হত্যার শিকার হন দুজন সেক্টর কমান্ডার ও একজন সাব-সেক্টর কমান্ডার। আর এই ৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে ২১ জুলাই ১৯৭৬ সালে ফাঁসিতে মৃত্যুবরণ করেন আরেকজন সেক্টর কমান্ডার। এছাড়া সেনাবাহিনীর ভেতরে ১৩ জন হত্যার শিকার হন। স্বাধীনতা যুদ্ধেও কোনো সেক্টর কমান্ডারকে প্রাণ হারাতে হয়নি।’

১৫ আগস্ট (১৯৭৫) বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল কাজী মুহাম্মদ (কে এম) শফিউল্লাহর স্থলে সেনাবাহিনী উপপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে প্রতিস্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধুর অপসারণকে পাকিস্তান স্বাগত জানায় এবং চীন ও সৌদি আরব বাংলাদেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। সেসময় চিফ অফ জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড পুনঃস্থাপনের জন্য বলেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান সে দায়িত্ব পালনে অক্ষমতার পরিচয় দেন।

সেনাবাহিনীর এক অংশ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের ওপর সন্তুষ্ট ছিল না। অন্যদিকে কর্নেল শাফায়াত জামিল ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহেরের মতো অফিসাররা খুনি মোশতাককে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। দ্রুত কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে, বাংলাদেশের সেনানিবাসগুলোতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) আবু তাহের সরকার প্রতিস্থাপনের জন্য তার ও মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের অনুগত সৈনিকদের সংগঠিত করেন। তারা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থানের নামে হত্যা শুরু করে।

খালেদ মোশাররফ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল এটিএম হায়দার অভ্যুত্থানকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু ব্যর্থ হন, সেনাবাহিনীর সৈন্যরা তাদের হত্যা করে। কেবল তাদের নয় অসংখ্য দেশপ্রেমিক সেনাকে সেদিন ও তার পরের বছরগুলোতে মৃত্যুর শীতল পরশে নিমজ্জিত হতে হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে বঙ্গভবনে যেমনটি হয়েছিল ঠিক তেমনি ৭ নভেম্বরে রাস্তায় সৈন্যরা চিৎকার করে ‘নারা-ই-তাকবির’এবং ‘সিপাহী-জনতা জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেয়।

আসলে ৭ নভেম্বরের ঘটনা ও হত্যাকাণ্ডগুলো জিয়াউর রহমানকে সরকারে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছিল। অথচ কর্নেল তাহেরকে ২১ জুলাই ১৯৭৬ আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ফাঁসি দেওয়া হয় জিয়ার চক্রান্তেই। আর ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ পরবর্তী সেনা বিদ্রোহগুলোতেও ভূমিকা রেখেছিল।

লেখাবাহুল্য, জেনারেল জিয়াউর রহমান তার পাঁচ বছরের অবৈধ শাসনামলে প্রায় ২১টি অভ্যুত্থানের মুখোমুখি হয়েছিলেন। ২০টি অভ্যুত্থান থেকে বেঁচে গেলেও ২১তম অভ্যুত্থানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এর অধিকাংশই ছিল ১৯৭১ সালের সেই সব মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের সমন্বয়ে গঠিত, যারা জিয়ার পাকিস্তানি ভাবাদর্শের সঙ্গে সম্পর্ক সহ্য করতে পারেননি। তিনি এসব আন্দোলন দৃঢ়ভাবে দমন করেন। হত্যা করেন সশস্ত্র বাহিনীর অজস্র কর্মকর্তাকে।

জিয়ার আমলে ১৯৭৭ সালে ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল স্থল ও বিমানবাহিনীর প্রায় ১০০ জন সেপাই। এতে বিমানবাহিনীর একজন অফিসারসহ ২১ জন অফিসার ও সেনা নিহত হন। বিদ্রোহী সেনা মিলে মোট ২০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে এ ঘটনায় বিনা বিচারে হত্যা করা হয়। মূলত ইতিহাসের বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর খুনি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন যেমন, তেমনি তাঁর আমলে ভারত থেকে জাপান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ছিনতাই করে ঢাকা নিয়ে আসা হয়েছিল।

প্রায় দেড় সপ্তাহের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির পর ঢাকায় নিয়ে আসা ওই জাপানি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনার অবসান হয়েছিল ৫ অক্টোবর (১৯৭৭)। ওই ছিনতাই ঘটনার মধ্যেই ঘটেছিল জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে বিমানবাহিনীর বিদ্রোহ। আর বিদ্রোহী বিমানবাহিনীর সদস্যদের নির্মমভাবে খুন করে জাপানি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাকে ভিন্নখাতে পরিচালিত করেছিলেন জিয়া।

আসলে ৭ নভেম্বরের মাধ্যমে সামরিক বাহিনী সরাসরি দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতি ও শাসনকাজে জড়িয়ে পড়ে। এতে করে আমাদের গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এজন্য বলা হয়, জিয়ার মতো সামরিক শাসকদের পাকিস্তানপন্থা ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিই এদেশের জন্য অভিশাপ বয়ে এনেছিল। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে শুরুর দিকে খালেদ মোশাররফ ছিলেন মূল নায়ক। অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, হত্যাকাণ্ড ও নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়েই জিয়া ক্ষমতায় চলে আসেন। সামরিক শাসনের রাজনীতি পুনরায় চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে জিয়াউর রহমান প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যান।

ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন তার ‘বাংলাদেশ: রক্তাক্ত অধ্যায় (১৯৭৬-৮১)’ বইতে ৭ নভেম্বর নিয়ে লিখেছেন, ‘সেদিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ড স্ট্রাকচার সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে এবং চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা ধারণ করে। এ রকম অস্থিতিশীল অবস্থা পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে ঘটেছে বলে মনে পড়ে না এবং কারও পক্ষে কিছু বলার বা করারও ছিল না। ৭ নভেম্বরের রেশ থেকে যায় দীর্ঘদিন এবং সেনাবাহিনীতে ক্যু স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। ৭ নভেম্বরের পর থেকে জেনারেল জিয়া হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত মোট ২১টি ছোটবড় সশস্ত্র রক্তাক্ত অভ্যুত্থান হয় এবং ২১তম অভ্যুত্থানে নিহত হয় জিয়াউর রহমান।’

প্রকৃতপক্ষে রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্ট গবেষকরা ৭ নভেম্বরকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পুনরাবৃত্তি হলে ওয়েবসাইট ও গবেষকদের সূত্র মতে উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালের এদিনে তথাকথিত সিপাহী বিপ্লবের নামে প্রথমে হত্যা করা হয় তিন খ্যাতনামা মুক্তিযোদ্ধাকে। এরা হলেন- খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম, কে এন হুদা বীর উত্তম এবংএ টি এম হায়দার বীর বিক্রম। দশম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদর দপ্তরে অবস্থানকালে সকালে তাদের একেবারে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে দুজন কোম্পানি কমান্ডার আসাদ এবং জলিল। সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহ্যাস এ ব্যাপারে তার গ্রন্থে লিখেছেন ‘এছাড়াও এদিন উচ্ছৃঙ্খল জওয়ানরা একজন মহিলা ডাক্তারসহ ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে। এমনকি একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রীকেও এ সময় হত্যা করা হয়।’

অন্যদিকে লেখক গবেষক গোলাম মুরশিদ তার ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর’ গ্রন্থে লিখেছেন কর্নেল শাফায়াত জামিল বিদ্রোহের খবর পেয়েও থেকে গিয়েছিলেন বঙ্গভবনে। কিন্তু যখন বিদ্রোহী সেনারা স্লোগান দিতে দিতে বঙ্গভবনের কাছাকাছি পৌঁছে যায় তখন তিনি সঙ্গীদের নিয়ে দেওয়াল টপকে পালিয়ে যান। এতে তার পা ভেঙে যায় এবং পরে ধরা পড়েন। তার জায়গা হয় সামরিক হাসপাতালে। অবশ্য তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। এর আগে ৬ নভেম্বর ভোর রাতে গৃহবন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতে যায় বঙ্গবন্ধুর খুনি ফারুকের ল্যান্সার বাহিনীর একটি দল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার অন্যতম ঘাতক ল্যান্সার মহিউদ্দিন ছিল এই দলের নেতৃত্বে। তারা জিয়াকে মুক্ত করে নিয়ে আসে কর্নেল রশিদের দুই নম্বর অ্যাটিলারি রেজিমেন্টের দপ্তরে।

গোলাম মুরশিদ আরও বলেন, মুক্তি পেয়েই জিয়াউর রহমান সদ্য নিযুক্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের অনুমতি ব্যতিরেকে বেতারে ভাষণ দিতে চলে যান। ’৭১-এর ২৭ মার্চের মতোই সংক্ষিপ্ত ঘোষণা দিয়ে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দাবি করেন। পরে অবশ্য পদবি বদলিয়ে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়েছিলেন।

পরবর্তীসময়ে গণভোট (হ্যাঁ-ভোট ও না-ভোট), প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, স্থানীয় পরিষদ নির্বাচন এবং পার্লামেন্ট নির্বাচন দিয়ে জিয়াউর রহমান নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও তার আমলে প্রায় প্রতি তিন মাসে একটি করে অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল বলে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। এ বিষয়ে গোলাম মুরশিদ বলেন, ‘একবার ফারুক-রশিদ ইত্যাদির শৃঙ্খলা ভঙ্গকে ক্ষমা করার পর জিয়া সেনাবাহিনীকে শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে খুবই চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু একটার পর একটা অভ্যুত্থান সেনাবাহিনীতে হতেই থাকে। প্রতিটি অভ্যুত্থানের পর বহু সেনা সদস্যকে তিনি ফাঁসিতে ঝোলান। অনেককে বিনা বিচারে পাইকারিভাবে হত্যা করে গণকবর দেওয়া হয়। বিশেষ করে ’৭৭ সালের ২ অক্টোবর বিমানবাহিনীর অভ্যুত্থানের পর শত শত লোককে বিনা বিচারে অথবা সংক্ষিপ্ত বিচারে হত্যা করা হয়। ফলে এমন অবস্থা দাঁড়ায় যে, বিমানবাহিনীতে মাত্র ১১ জন কর্মকর্তা থাকেন। তাদের মধ্যে বিমান চালাতে পারতেন মাত্র তিনজন।’ মার্কাস ফ্র্যান্ডার মতে, এই অভ্যুত্থানের কারণে আড়াই হাজার সেনা সদস্য নিহত হন।

সর্বশেষ ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক পূর্ণ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর মেজর মঞ্জুরসহ ১১ জন সামরিক কর্মকর্তা যাদের মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ছিল সাত্তার সরকার প্রহসনের বিচারে ফাঁসি দিয়ে ও গুলি করে তাদের হত্যা করে। এভাবে ষোলকলা পূর্ণ হয় মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যার ইতিহাস দিয়ে।

জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারকে বন্ধ করেছিলেন সে কথাও স্মরণ করা দরকার। ১৯৭৬ সালের ২৯ এপ্রিল জিয়া রাষ্ট্রপতি সায়েমের কাছ থেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়ে নেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করান এবং নিজে রাষ্ট্রপতি হন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেন তিনি। সংসদে উত্থাপিত আইনটির নাম ছিল সংবিধান (সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯। এটি সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের ১৮ অনুচ্ছেদে সংযুক্ত হয়েছিল। পঞ্চম সংশোধনীকে বৈধতা না দিলে জিয়াউর রহমানের আমলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করা যেত কিন্তু জিয়াউর রহমান তা করেননি। এই সামরিক জান্তা বরং খুনিদের সুবিধা দিয়ে চাকরি দিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন পরে অভ্যুত্থান এবং তার প্রতিক্রিয়ায় ৭ নভেম্বরে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটেছিল। একের পর এক এসব ঘটনায় তখন বিচলিত ছিল দেশের সাধারণ মানুষ। আর সেসময় জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার পর মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের হত্যা করে আওয়ামী লীগবিরোধী মনোভাবকে তিনি রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন। লেখাবাহুল্য, সামরিক শাসক জিয়া আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এবং পাকিস্তানপন্থার পক্ষাবলম্বন করে পরাজিত পাকিস্তানপন্থার সমর্থকদের সমর্থন আদায় করে নেন। কেবল সমর্থন আদায় নয়, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিপক্ষকে নিঃশেষ করার সফল অধিনায়ক ছিলেন তিনি। মূলত ৭ নভেম্বর তার ক্ষমতায় আসীন হওয়ার দিনটি ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে চিহ্নিত যা এদেশের ইতিহাসের কলঙ্কজনক অধ্যায়।

লেখক: বঙ্গবন্ধু গবেষক এবং কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

জা,ই

সর্বশেষ

জনপ্রিয়