বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬ , ২১ আশ্বিন ১৪৩৩

Aporup Bangla

রোজারিও থেকে বিশ্বজয়, আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মেসি

খেলাধুলা

অপরূপ বাংলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩:২৬, ৬ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

রোজারিও থেকে বিশ্বজয়, আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মেসি

ফাইল ছবি

ভোরের শহর তখনও পুরোপুরি জেগে উঠবে না। বাংলাদেশের ঘড়িতে বাজবে ভোর ৫টা। অথচ পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে তখন তৈরি হবে ইতিহাসের এক আবেগঘন মুহূর্ত—শেষ হবে একটি যুগের।

আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে ৭ অক্টোবর শেষবারের মতো মাঠে নামবেন লিওনেল মেসি। প্রতিপক্ষ বেনিন। ম্যাচটি প্রীতি ম্যাচ হলেও মেসির জন্য এর গুরুত্ব অন্যরকম। আর্জেন্টিনার হয়ে এটি তার ২০৮তম এবং শেষ ম্যাচ।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যে জার্সিকে নিজের দ্বিতীয় চামড়ার মতো ধারণ করেছেন, আগামীকাল ভোরে সেটিই শেষবারের মতো গায়ে তুলবেন আর্জেন্টিনার সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার।

সেই জার্সিতে জমে আছে কত গল্প—কান্না, অপেক্ষা, হতাশা, সমালোচনা, প্রত্যাবর্তন আর শেষ পর্যন্ত বিশ্বজয়ের গৌরব।

১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম লিওনেল আন্দ্রেস মেসির। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ছিল তার পৃথিবী। মাত্র আট বছর বয়সে যোগ দেন নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের বয়সভিত্তিক দলে।

কিন্তু ফুটবলের মতোই ছোট ছিল তার শরীর। মেসির শরীরে ধরা পড়ে বৃদ্ধির হরমোনের ঘাটতি। চিকিৎসার খরচও পরিবারের জন্য হয়ে ওঠে বড় বোঝা।

সেখান থেকেই আসে জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে স্পেনে পাড়ি জমান মেসি। বার্সেলোনার বিখ্যাত একাডেমি লা মাসিয়ায় শুরু হয় নতুন অধ্যায়। পরিবার থেকে দূরে, নতুন দেশ ও নতুন ভাষা—সবকিছুর মাঝেও বল পায়ে সেই ছোট্ট ছেলেটি যেন নিজের ভাষা খুঁজে পেয়েছিল।

২০০৪ সালে বার্সেলোনার মূল দলের হয়ে অভিষেক। তখন কেউ জানত না, এই কিশোর একদিন ক্লাবটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নাম হয়ে উঠবেন।

বার্সেলোনার হয়ে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল ও ৩০৫ অ্যাসিস্ট। জিতেছেন ৩৫টি শিরোপা। ১০টি লা লিগা, চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং সাতটি কোপা দেল রে—ট্রফির পর ট্রফি জমতে থাকে তার পায়ের কাছে।

২০০৯, ২০১১ ও ২০১৫ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের ফাইনালে মেসির অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আর ২০১২ সালে ফুটবল বিশ্বকে অবাক করে এক ক্যালেন্ডার বছরে করেন ৯১ গোল।

বার্সেলোনায় মেসি শুধু একজন তারকা ছিলেন না। হয়ে উঠেছিলেন একটি যুগের নাম।

কিন্তু ক্লাবের সাফল্যের সঙ্গে জাতীয় দলের গল্পটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে অভিষেক হয় মেসির। তার আগে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জিতে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছিলেন। কিন্তু সিনিয়র দলে শুরু থেকেই ছিল প্রত্যাশার পাহাড়।

২০০৬ বিশ্বকাপে অভিষেক। ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনাল। জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ে হার। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালে টানা দুই কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পরাজয়।

বার্সেলোনার হয়ে মেসির হাতে তখন প্রায় সবকিছু। কিন্তু দেশের হয়ে বড় কোনো শিরোপা নেই।

সমালোচনার তীর ছুটে আসতে থাকে তার দিকে। বলা হতে থাকে, বার্সেলোনার মেসি আর আর্জেন্টিনার মেসি এক নন।

২০১৬ সালে চিলির কাছে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর জাতীয় দল থেকেই অবসরের ঘোষণা দেন মেসি। মনে হয়েছিল, হয়তো এখানেই শেষ হয়ে যাবে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার গল্প।

কিন্তু মেসির গল্পে ‘শেষ’ শব্দটি যেন বারবার নতুন শুরুর নাম হয়ে এসেছে।

তিনি ফিরে এলেন। আর বদলে যেতে শুরু করল আর্জেন্টিনার গল্পও।

২০২১ কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে অবশেষে দেশের হয়ে বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতলেন মেসি। ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে জিতলেন ফিনালিসিমা।

এরপর কাতার।

২০২২ বিশ্বকাপ যেন লেখা হয়েছিল মেসির জন্যই। সৌদি আরবের কাছে হার দিয়ে শুরু। এরপর একের পর এক ম্যাচ, একের পর এক গোল, একের পর এক পরীক্ষা।

সবশেষে ফ্রান্স।

বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়ে উঠল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ম্যাচ। নির্ধারিত সময়, অতিরিক্ত সময়—সব নাটকীয়তার পর টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা।

অবশেষে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা।

আর মেসির দুই হাতে ওঠে সেই ট্রফি, যে ট্রফির অভাব দেখিয়ে তাকে বছরের পর বছর সমালোচনা করা হয়েছিল।

২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা। আবারও শিরোপা।

মেসি তখন আর শুধু আর্জেন্টিনার অধিনায়ক নন; তিনি হয়ে উঠেছেন দেশটির ফুটবল পরিচয়েরই একটি অংশ।

২০২৬ বিশ্বকাপেও তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনা দলের প্রধান মুখ। ছয়টি বিশ্বকাপে খেলে গড়েছেন বিরল এক কীর্তি। আট গোল ও চার অ্যাসিস্টে আরও একবার নিজের সামর্থ্যের জানান দেন। আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ফাইনালে স্পেনের কাছে হারলেও মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ হয় আরও কিছু রেকর্ড নিয়ে।

তবে নশ্বর পৃথিবীর সবকিছুকেই একসময় থেমে যেতে হয়।

৩১ আগস্ট আসে সেই ঘোষণা—আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর নয়।

‘সময় এসে গেছে’—এই উপলব্ধি মেনে নিয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান মেসি।

বেনিনের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল। সঙ্গে ৬৬ অ্যাসিস্ট। আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এবং সবচেয়ে বেশি গোল করা ফুটবলারও তিনি।

২০৭ ম্যাচের সেই দীর্ঘ যাত্রায় আছে ছয়টি বিশ্বকাপ, একাধিক কোপা আমেরিকা, একটি ফিনালিসিমা, একটি বিশ্বকাপ জয় এবং অসংখ্য ব্যক্তিগত রেকর্ড।

আছে ২০১৪ সালের কান্না।

আছে ২০১৬ সালের অবসর ঘোষণা।

আছে ২০২১ সালের স্বস্তির হাসি।

আর আছে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ হাতে উঁচিয়ে ধরা সেই ঐতিহাসিক ছবি।

আগামীকাল ভোরে বাংলাদেশের ঘড়িতে যখন ৫টা বাজবে, তখন হয়তো অনেকেই ঘুম থেকে উঠে টেলিভিশন কিংবা মুঠোফোনের পর্দায় চোখ রাখবেন।

মনুমেন্তালে তখন হাজারো দর্শকের ভিড়। তাদের সামনে আকাশি-সাদা জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামবেন মেসি।

তারা জানবেন—এই দৃশ্য আর কখনো দেখা যাবে না।

মেসি আর আর্জেন্টিনার জার্সি পরবেন না। আরেকটি বিশ্বকাপের স্বপ্ন নিয়ে জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামবেন না। কোনো ফাইনালের আগে তার পায়ের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করবে না পুরো ফুটবল বিশ্ব।

তবু মেসির গল্প শেষ হবে না।

মানুষ রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটিকে মনে রাখবে। মনে রাখবে লা মাসিয়ার সেই কিশোরকে, যে একদিন বার্সেলোনার ১০ নম্বর হয়ে পৃথিবী মাতিয়েছিল।

মনে রাখবে সেই অধিনায়ককে, যিনি বারবার হেরেও ফিরে এসেছিলেন।

আর মনে রাখবে সেই মানুষটিকে, যিনি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতে প্রমাণ করেছিলেন—অপেক্ষা যত দীর্ঘই হোক, স্বপ্ন পূরণের মুহূর্ত একদিন আসেই।

রোজারিও থেকে বিশ্বজয়—লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের শেষ পাতায় তাই শুধু বিদায় নেই।

আছে একটি পূর্ণতার গল্প।

ম.র

সর্বশেষ

জনপ্রিয়