মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬ , ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

Aporup Bangla

হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, ঠেকাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা

সারাবিশ্ব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৫৪, ৫ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

হামলা চালাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, ঠেকাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা

ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কায় যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা। যদিও দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণের ঝুঁকি কম এবং এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হওয়ায় সব ধরনের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া দায়িত্বের অংশ বলে মনে করেন তিনি।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, এটি মূলত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়।


ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতি এবং বারবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বক্তব্যের কারণে কানাডা মার্কিন হামলার সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে সামরিক মহড়া বা যুদ্ধের মডেল তৈরি করছে।
২০২৫ সালে ট্রাম্প বলেছিলেন, কানাডার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা ‘অত্যন্ত কম’।

রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে তিনি সামরিক শক্তির পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার কথা বলেছিলেন। এদিকে হোয়াইট হাউস বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, কানাডার মহান জনগণকে সুরক্ষায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে বেশি কেউ কিছু করেননি।
সামরিক বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ দুই দেশ প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। তবে বিষয়টি কানাডীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করার পর লেজার পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৩০ শতাংশের বেশি কানাডীয় মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে।

কেন হামলার সম্ভাবনা কম
কানাডার সাবেক সামরিক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস বলেন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ হবে এমন ধারণা করা অত্যন্ত জটিল এবং প্রায় কল্পনাতীত। ৩৪ বছরের সামরিক জীবনে তিনি কখনো যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে কানাডার বিরুদ্ধে সামরিক হামলার সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা করতে দেখেননি।

দুই দেশই নর্থ আটলান্টিক প্রতিরক্ষা জোট- ন্যাটোর সদস্য। জোটের নিয়ম অনুযায়ী কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের তার প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পাশাপাশি উত্তর আমেরিকার আকাশ ও মহাকাশ প্রতিরক্ষায় দুই দেশ যৌথভাবে নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড নোরাডের অধীনে কাজ করে এবং নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করে।

কোটসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র কানাডায় হামলা চালালে তা সরাসরি সামরিক আক্রমণ দিয়ে শুরু নাও হতে পারে। বরং সাইবার যুদ্ধের মতো অপেক্ষাকৃত গোপন পদ্ধতি দিয়ে শুরু হতে পারে।

সবসময় এমন বন্ধুত্ব ছিল না
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ২০ শতকের শেষার্ধে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র স্বাভাবিক মিত্রে পরিণত হয়। অর্থনীতি, সামরিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতিতেও দুই দেশ ব্যাপকভাবে একীভূত হয়েছে। তবে ইতিহাসের সবসময় তাদের সম্পর্ক এমন ছিল না।

কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক টিম ফোরান বলেন, ১৮ ও ১৯ শতকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কানাডার পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রকে ভয় পাওয়ার বিষয়টি কানাডার রাজনৈতিক প্রকল্পের ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত।

কানাডা গঠনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকার উপনিবেশগুলোতে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিল। ১৭৭৫ সালে তারা মন্ট্রিয়ল দখল করে এবং কুইবেক সিটি প্রায় জয় করে ফেলেছিল।

১৮১২ সালের যুদ্ধে আমেরিকান বাহিনী তৎকালীন আপার কানাডা, লোয়ার কানাডা ও সামুদ্রিক উপনিবেশগুলোতে একাধিকবার হামলা চালায়। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ অমীমাংসিত অবস্থায় শেষ হয়। ওই যুদ্ধে প্রতিশোধ হিসেবে ব্রিটিশ সেনারা হোয়াইট হাউস পুড়িয়ে দিয়েছিল।

ফোরান বলেন, তখন পরবর্তীকালে কানাডায় পরিণত হওয়া উপনিবেশগুলো প্রতিরক্ষার জন্য গ্রেট ব্রিটেন ও রয়্যাল নেভির ওপর নির্ভর করত। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্যরাও জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও প্রভাবের কারণে কানাডা দেশটির সঙ্গে যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিল। সে সময় কানাডা একটি পরিকল্পনাও তৈরি করে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কানাডীয় সেনাবাহিনীর জেনারেলরা পর্যটকের পরিচয়ে সীমান্তবর্তী মার্কিন শহরগুলোতে গোপনে গিয়ে সেতু ও মহাসড়কের ছবি তুলতেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গেও কথা বলতেন তারা।

কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক অ্যান্ড্রু বার্চ বলেন, তখনও যুদ্ধের সম্ভাবনা কম ছিল। তবে কানাডা প্রস্তুত থাকতে চেয়েছিল। তার মতে, বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি কল্পনা করা সামরিক বাহিনীর কাজেরই অংশ।

যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে কী হতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম হলেও কানাডার প্রস্তুতি বিশ্বব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বলে মনে করেন কানেকটিকাটের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ শ্মিট।

তার মতে, কানাডার নেতাদের এখন ভাবতে হচ্ছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যেতে চান। কারণ এই অংশীদারত্ব থেকে কানাডা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়, যা কোনো পরিস্থিতিতে দেশটির বিরুদ্ধে ব্যবহারও করা যেতে পারে।

শ্মিট বলেন, ট্রাম্পের কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার বক্তব্য আমেরিকানরা হয়তো গুরুত্ব দিয়ে নাও নিতে পারেন। কিন্তু কানাডীয়রা বিষয়টি স্পষ্টতই গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন এবং প্রয়োজন হলে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি রাখছেন।

কানাডীয় সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত একটি মডেলের বরাত দিয়ে গ্লোব অ্যান্ড মেইল চলতি বছরের শুরুতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে এক সপ্তাহের মধ্যেই কানাডার কৌশলগত অবস্থানগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

এরপর সংখ্যায় পিছিয়ে থাকা কানাডীয় বাহিনী গেরিলা ধরনের যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করে প্রতিপক্ষকে দমন করার চেষ্টা করতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কানাডার পক্ষ থেকে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মতো মিত্র দেশগুলোর কাছে সহায়তা ও প্রতিরক্ষার আবেদন জানানো হতে পারে।

কানাডার এই মডেলকে এক শতাব্দীর মধ্যে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা হিসেবে মনে করা হচ্ছে। তবে কোটসের মতে, এটি সামরিক যুদ্ধ পরিকল্পনার তুলনামূলক হালকা পর্যায়ের মডেল।

তার মতে, স্থল হামলার মতো পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে- এমন পরিকল্পনা তৈরিতে কানাডা ন্যাটোর মিত্রদের তুলনায় পিছিয়ে ছিল। বর্তমান অনিশ্চিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশটি এখন সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে।

এদিকে কানাডার প্রতিরক্ষা প্রধান সম্প্রতি দেশটির সামরিক বাহিনীর আকার ব্যাপকভাবে বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩ লাখ কম প্রশিক্ষিত নাগরিক সেনা যুক্ত করার বিষয়ও রয়েছে।

তবে কানাডায় হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও সহজ হবে না বলে মনে করেন শ্মিট। তার মতে, কানাডার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার বিষয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর ভেতরেও ব্যাপক আপত্তি দেখা দিতে পারে।

তিনি বলেন, অনেক মার্কিন কর্মকর্তা এমন আদেশ পেলে পদত্যাগ করতে পারেন। তাদের কাছে এটি অবৈধ ও অনৈতিক আদেশ বলে মনে হতে পারে।

কানাডীয় ও মার্কিন সেনারা নিয়মিত একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নেয় এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান রয়েছে। তবে দুই দেশের সম্পর্ক যুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছালে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত কানাডার তেল ও খনিজ সম্পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ দখল এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অকার্যকর করার দিকে নজর দিতে পারে বলে মনে করেন শ্মিট।

তার মতে, এমন অভিযান চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটক করতে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল, তার সঙ্গে কিছুটা মিল থাকতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা বেশি হলেও ‘সমান সক্ষমতার বিচারে’ কানাডীয় সেনারাও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন শ্মিট।

সূত্র: বিবিসি

ম.র

সর্বশেষ