মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ , ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০

modhura
Aporup Bangla

সাক্ষাৎকারে তিন অর্থনীতিবিদ

বাংলাদেশ ব্যাংকের রোডম্যাপ ভালো তবে বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে

সাক্ষাৎকার

অপরূপ বাংলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:১৭, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

আপডেট: ১০:১৯, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সর্বশেষ

বাংলাদেশ ব্যাংকের রোডম্যাপ ভালো তবে বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে

ছবি : সংগ্রহ

ব্যাংকিং খাতে অবলোপনসহ খেলাপি ঋণ রয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি। তবে বাস্তবে খেলাপি ঋণ দ্বিগুণেরও বেশি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ব্যাংকিং খাতে এ পাহাড় সমান খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেয়া হলেও খেলাপি ঋণ কমেনি; বরং প্রতি বছরই গাণিতিক হারে বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন অর্থমন্ত্রী আবারো খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা ও খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১১ দফা রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ৮ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, খেলাপিদের ধরতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে। বিশেষ করে ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত করে তাদের বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রোডম্যাপকে স্বাগত জানিয়েছে বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তারা। অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণখেলাপিদের আঁতাত কীভাবে ভাঙবে- তার রোডম্যাপ আগে তৈরি করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন রোডম্যাপ অনুযায়ী, আইএমএফের শর্তের আলোকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৮ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকের ১০ শতাংশের নিচে এবং বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে নামাতে হবে। তবে সা¤প্রতিক সময়ে ঋণ পরিশোধ না করেও যে উপায়ে খেলাপিমুক্ত থাকার সুযোগ দেয়া হচ্ছে, তা করা যাবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, রোডম্যাপ অনেক ভালো হয়েছে। তবে এর বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক কতটুকু সক্ষম- তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ঋণখেলাপিদের আঁতাত কীভাবে ভাঙবে, বিষয়টি আমার কাছে পরিষ্কার নয়। আগে আঁতাত ভাঙতে রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। ড. আজিজ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের যে তথ্য দেয়, বাস্তবে তা আরো বেশি। খেলাপি হওয়ার পর পুনঃতফসিল করা ঋণও খেলাপি; কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক তা দেখায় না। খেলাপি হওয়ার পর গ্রাহক উচ্চ আদালতে গিয়ে স্থিতিবস্থার আদেশ নিয়ে আসে। ওই ঋণকেও খেলাপি দেখানো হয় না। আবার কোনো ঋণখেলাপি হলে অবলোপন করতে পারে বাণিজ্যিক ব্যাংক। অবলোপন বা রাইট অফ হচ্ছে মন্দমানের ঋণকে ব্যাংকের স্থিতিপত্র থেকে (ব্যালেন্স শিট) বাদ দিয়ে পৃথক হিসাবে রাখা। বর্তমানে অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ অর্থনীতি বিশ্লেষক বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া নতুন রোডম্যাপ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে ব্যাংক খাতের সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসবে। তবে এটা সম্পূর্ণই নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছার ওপর।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে. মুজেরী ভোরের কাগজকে বলেন, ব্যাংক খাতে নানা ধরনের সমস্যা নিয়ে আমরা বহুদিন

ধরে বলে আসছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আবার বিভিন্ন সময়ে নানা ঘোষণা দেয়া হলেও বাস্তবে তার কিছুই হয়নি। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে পথনকশা ঘোষণা করেছে, এজন্য তাদের ধন্যবাদ। বাংলাদেশ ব্যাংক যে রোডম্যাপ তৈরি করেছে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে ব্যাংকিং খাতে সুফল পাওয়া যাবে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে- সংস্কারকে কতটা গুরুত্বসহকারে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার। এ অর্থনীতিবিদ বলেন, রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করতে কঠোর অবস্থান প্রয়োজন। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক হলেই হবে না, সরকারেরও সদিচ্ছা থাকতে হবে। সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া আর্থিক খাত সংস্কার করা সম্ভব নয়। কারণ অতীতে অনেকবার এ ধরনের রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে, তবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সদিচ্ছার সঙ্গে কঠোর রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে তবেই নতুন রোডম্যাপ বাস্তবায়ণ সম্ভব হবে। তিনি আরো বলেন, ব্যাংক তদারকিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো দক্ষতা দেখাতে হবে। আইনকানুন পরিপালনে কাউকে ছাড় দিয়ে টিকিয়ে রাখার প্রথা তুলে নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিবেচনায় সব ব্যাংকের পরিচালকদের এক কাতারে রাখতে হবে। যখন যা সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন, তা নিতে হবে। তাহলে এর সুফল পাবে দেশের অর্থনীতি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাগজে-কলমে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের ২১ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং বেসরকারি ব্যাংকের ৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। তবে আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা। আইএমএফের শর্তের আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি বা মোট ঋণের ২৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ দুর্দশাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তথ্য অনুযায়ী, ওভারডিউ পিরিয়ড বাড়ানোর সঙ্গে ২০১৯ সালে ঋণগ্রহীতারা একটি বড় সুযোগ পেয়েছিলেন। তারপর ২০২০ সালের মার্চ মাসে, কোভিড মহামারির কারণে, তারা পুরো বছরের জন্য ঋণ পরিশোধ থেকে স্বস্তি পেয়েছিলেন। ২০২২ সালে, ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ না করার জন্য বকেয়া ঋণের মাত্র ১৫ শতাংশ পরিশোধ করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। কিছু পরিবর্তনসহ এ সুবিধা ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত কার্যকর ছিল।
পরিচালক পর্ষদের সভা শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু ফরাহ মো. নাছের সাংবাদিকদের বলেছেন, খেলাপিদের ধরতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে। বিশেষ করে ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত করে তাদের বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হবে। তারা নতুন করে জমি, বাড়ি ও গাড়ি কিনতে পারবেন না। নতুন ব্যবসাও খুলতে পারবেন না। ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সীমাতিরিক্ত ঋণ, বেনামি স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং জালিয়াতি অথবা প্রতারণার মাধ্যমে ঋণ বিতরণ প্রবণতা শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকের বৈশিষ্ট্য ঠিক করে দিয়েছে। কোনো ব্যাংক এর মধ্যে পড়লে আগামী বছরে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া হবে। উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে যেসব ঋণখেলাপি ব্যাংকের পরিচালক আছেন, তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোর্টের আদেশের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক পদক্ষেপ নিতে পারে না।
এ বিষয়ে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, উন্নত দেশে অর্থঋণের বিষয়ে হাইকোর্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানায় না। বাংলাদেশে এ চর্চা রয়েছে এবং ঋণখেলাপিরা এর সুযোগ নিচ্ছে। তাই খেলাপি কমাতে কোর্ট, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, আইএমএফের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে এবং ব্যাংক খাত শক্তিশালী করতে নতুন একটি রোডম্যাপের প্রয়োজন ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক এই রোডম্যাপ কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব উদ্যোগ মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে (আইএমএফ) দেখানোর জন্য। শর্ত পূরণ করতে না পারলেও তারা ব্যাংকগুলোকে কিছু বলে না। খেলাপিদের ধরতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে রোপম্যাপ দিয়েছে, এটা ভালো। অতীতে এরকম যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, সেগুলো ছিল কাগুজে। এটাও তেমন হবে কিনা, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নে তারা সঠিক উদ্যোগ নিচ্ছে কিনা, তার ওপর। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক শক্ত হাতে কোনো পদক্ষেপই বাস্তবায়ন করতে পারে না। তিনি বলেন, নতুন রোডম্যাপে অবলোপনের সময় কামানো হচ্ছে, আবার ঋণখেলাপির সময়সীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৩ মাসে নামিয়ে আনা হচ্ছে। এগুলো করলে পরিস্থিতি আরো কঠিন হবে। খেলাপি ঋণ না কমে আরো বাড়বে। ব্যাংকগুলোকে কিছু করতে বললেই তারা সময়ক্ষেপণ করে। এটা পুরনো রোগ। তাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

জ.ই

সর্বশেষ

জনপ্রিয়