মঙ্গলবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ , ১৪ ফাল্গুন ১৪৩০

modhura
Aporup Bangla

‘আড়াই প্যাঁচের জিলাপি’ এবং ফুটবলার ‘চুন্নু’      

সাক্ষাৎকার

মোরসালিন আহমেদ

প্রকাশিত: ০৯:৫০, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

আপডেট: ১০:৩৯, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সর্বশেষ

‘আড়াই প্যাঁচের জিলাপি’ এবং ফুটবলার ‘চুন্নু’      

আশরাফ উদ্দিন চুন্নু

                                                     
উপমহাদেশের প্রখ্যাত লেফটউইঙ্গার ‘আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু’ হয়তো নতুন প্রজন্মের কাছে ঠিক সেভাবে পরিচিত নন। তবে সত্তর-আশি দশকের মাঠ কাঁপানো এ ফুটবলারের খেলা যারা দেখেছেন- তারাই বলতে পারবেন, তিনি কত বড় মাপের খেলোয়াড় ছিলেন। ঘরোয়া ক্রীড়াঙ্গনে ‘চুন্নু’ নামেই সবাই বেশি চেনেন। তবে ঢাকার মাঠে তিনি ‘আড়াই প্যাঁচের জিলাপি’ হিসেবে ভীষণ জনপ্রিয় ছিলেন। শুধু তাই নয়, স্ট্রাইকার না হয়েও তিনি জাতীয় দলের হয়ে একমাত্র হ্যাটট্রিক করেন। তিনি জাতীয় দলের হয়েও করেছেন সর্বাধিক ১৭টি গোল। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে গৌরবোজ্জ্বল অবদান রাখায় পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া পুরস্কার। উপমহাদেশের প্রখ্যাত লেফটউইঙ্গার আলাউদ্দিন খানের দীক্ষায় নারায়ণগঞ্জ থেকে উঠে আসেন এ ফুটবলার। ‘অপরূপ বাংলা’র  জন্য তাঁর বিশেষ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মোরসালিন আহমেদ।   


অপরূপ বাংলা : আপনি যখন আশির দশকে খেলা ছেড়েছেন তখন বর্তমান প্রজন্মের জন্মই হয়নি। নতুন প্রজন্মের জন্য আপনার খেলোয়াড়ী জীবনের গল্পটা আবারও শুনতে চাচ্ছিলাম?   
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু : ব্রিটিশ আমল থেকেই নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় ফুটবলের ঐতিহ্য ছিল। ছোট্টবেলায় দেখতাম বাড়ির পাশে জিমখানা মাঠে (বর্তমানে আলাউদ্দিন খান স্টেডিয়াম) সবাই খেলতেন। তাদের দেখাদেখি আমিও মাঠে ছুটে যেতাম। কিন্তু বয়স অল্প থাকায় আমাকে কেউ নিতে চাইতেন না। একবার দু’ দলের খেলায় একজন কম থাকায় আমাকে খেলতে দেওয়া হয়। সেই থেকে ফুটবলের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলি। এসময় স্কুল ফুটবলে বেশ নাম কুড়াতে থাকি। সত্তর দশকে নারায়ণগঞ্জের ফুটবলার ছাড়া ঢাকার মাঠ প্রায় অচল ছিল। আমার খেলা দেখে তখন বেশ কয়টি ক্লাব আগ্রহ দেখায়। ফলে ঢাকার মাঠে আমি ১৯৭৩ সালে দিলকুশা স্পোটিং ক্লাব দিয়ে ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করি। পরের বছর ১৯৭৩ সালে রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটিতে যোগ দেই। কিন্তু দু’ বছর পেরোতে না পেরোতেই তৎকালীন বিখ্যাত বিখ্যাত খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া আবাহনী ক্রীড়া চক্রে (বর্তমানে আবাহনী লিমিটেড) ১৯৭৪ সালে ডাক পাই। আমার এই বর্ণাঢ্যময় ফুটবল ক্যারিয়ারের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ ছেলে, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও আধুনিক ক্রীড়াঙ্গনের আলোকবর্তিকা শহীদ ক্যাপ্টেন ‘শেখ কামাল’ ভাই।  
অপরূপ বাংলা : আবাহনীতে যখন ডাক পেলেন তখনকার পেছনের গল্পটাই বা কেমন ছিল?
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু : ১৯৭৪ সালে সবেমাত্র ঢাকার ফুটবল লিগ শেষ করেছি। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তখন ক্রিকেট লিগ চলছিল। সেসময়ে আউটার স্টেডিয়ামে (বর্তমানে মাওলানা ভাসানী জাতীয় হকি স্টেডিয়াম) ক্রিকেট হতো। আমার স্পষ্ট মনে আছে সেদিন আবাহনী ও ঈগলেটসের ম্যাচ চলছিল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতে দেখতে আবাহনীর টেন্টের কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। সেখানে ছোট্ট একটা গ্যালারি ছিল, পাশে গিয়ে খেলা দেখছিলাম। দেখছি কামাল ভাই (শেখ কামাল) প্যাড পড়ে বসে আছেন, নেক্সড যিনি আউট হবেন-তার জায়গায় খেলতে যাবেন। একবার খেলা দেখছি। আরেকবার কামাল ভাইকে দেখছি। একবার তাঁর চোখাচোখি হয়। চোখে চোখে পড়ার পর আমাকে হাত দিয়ে ইশারা দিলেন। আমি খেয়াল করিনি, বুঝতেও পারিনি আমাকে ডাকছেন। আমি আবার অন্যদিকে তাকালাম। কিছুক্ষণ পর দেখলাম- একটি ছেলে এসে বললো, আপনাকে ডাকছে। বললাম কে, বললো কামাল ভাই ডাকছেন। আস্তে আস্তে সামনে গিয়ে উনাকে সালাম দিলাম। সালাম দেওয়ার পর, উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এই তোর নাম  চুন্নু? আমি বললাম জী। তুই কি রহমতগঞ্জে খেলেছিস? আমি বললাম জি¦। আচ্ছা, তুই আগামী বছর আবাহনীতে খেলবি? আমার টিমে খেলবি তুই? এমন অফার পেয়ে আমার তো আকাশ থেকে পড়ার কথা। কারণ আবাহনীর মতো দল। আমার স্বপ্নের দল। আমার পছন্দের দল। আমাকে এ মুহূর্তে আবাহনীতে কামাল ভাই ডাকছেন! তখন কামাল ভাইকে বললাম, আমার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ। উনি বললেন, আমি জানি। আমি বললাম, বাবার সঙ্গে কথা বলে কাল এসে জানাব। কামাল ভাই বললেন, ঠিক আছে। আমাকে তাড়াতাড়ি জানাবি। তখন আমার মনের ভেতরে আনন্দের বন্যা বইয়ে যাচ্ছে। আমি আবাহনীতে ডাক পেয়েছি! 


অপরূপ বাংলা : তখন তো আবাহনীতে তারকা ফুটবলারের ছড়াছড়ি। আপনার মতো একজন তরুণের সেসময় দলে জায়গা পাওয়া কঠিন ছিল। তখনকার সেই অনুভূতিটা কেমন ছিল?
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু : সেখানে গিয়ে দলে জায়গা পাবো কি পাবো না- ভেবে দেখার সময় কোথায়। মনের ভেতরে আনন্দ বইয়ে যাচ্ছে, আমি আবাহনীতে খেলব। তখন টিপু ভাই (গোলাম সারওয়ার টিপু) গফুর ভাইদের (গফুর বালুচ) মতো লেফটউইঙ্গার আর ঢাকার ফুটবলের তৎকালীন বিখ্যাতরা আবাহনীতে আছেন, সেটা আমার মাথায় ছিল না। কামাল ভাই বলেছেন, আমি আবাহনীতে খেলব। সেই খুশি আর আনন্দে এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে সোজা বাড়ির পথে হাঁটা শুরু করলাম। আমার বাবা ছিলেন মোহামেডানের কট্টর সমর্থক এবং একজন ফুটবলপ্রেমী। বাড়ি গিয়ে বাবাকে যখন আবাহনীর কথা বললাম, তখন উনি বললেন- সেখানে অনেক বিখ্যাত খেলোয়াড়, তুই কি খেলার সুযোগ পাবি? বরং আরো দু’এক বছর এসব দলে খেল, তখন যাস। কিন্তু কালকের মধ্যে জানাতে না পারলে অন্য কাউকে আবাহনী নিয়ে নেবে। বাবার অমত দেখে ছুটে গেলাম আমার ওস্তাদ উপমহাদেশের বিখ্যাত লেফটউইঙ্গার আলাউদ্দিন খানের কাছে। উনাকে বিস্তারিত বললাম। শুনে ভীষণ খুশি হলেন। উনি বললেন, জীবনে একবারই সুযোগ আসে, বারবার আসে না। তুই গিয়ে যোগ দে। আমি তোর বাবাকে রাজি করাব। রাতেই মধ্যেই বাবাকে বুঝিয়ে রাজি করালেন আলাউদ্দিন খান- আমার ওস্তাদ।
অপরূপ বাংলা : সেসময় আবাহনী থেকে কেমন অফার পেয়েছিলেন?
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু : রহমতগঞ্জে আমি মোটামুটি ভাল খেলেছি বলেই কামাল ভাইয়ের চোখে পড়েছিলাম। সাত-সকালেই আবাহনীতে গিয়ে কামাল ভাইকে বললাম হ্যাঁ, আমি খেলব। কামাল ভাই বললেন, তুই খেলবি? আমি বললাম জি¦, খেলব। তখন তিনি খুশি হয়ে বললেন, তুই কি চাস, তুই কি চাস। কত টাকা চাস। সেসময় অল্প বয়স, ছোট্ট ছিলাম। আমি থতমত খেয়ে কাচুকাচু করছি। মনে মনে ভাবছি গত মৌসুমে রহমতগঞ্জ পাঁচ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল- পাইনি। বিনা পয়সায় লিগ খেললাম। আর আবাহনীতে পা না দিতেই এতোকিছুর অফার! আমি কোনো কথা বলছি না দেখে কামাল ভাই দু’টি অপশন দিলেন। এই মৌসুমে খেললে ১২ হাজার টাকা পাবি, নয়তো ওই সমপরিমান অর্থের একটি ভেসপা পাবি। এসময় হারুন ভাই (হারুন অর রশিদ) সামনে ছিলেন। আমি বললাম, বাড়ি থেকে এসে জানাব। বাড়ি এসে বলার পর বাবা বললেন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের রাস্তা ভাল না। এক্সসিডেন্টের ভয় আছে। বরং উনারা যেটা বলেছেন টাকাটাই নিয়ে নে। পাঁচ দিন পর ক্লাবে যোগ দিলাম। একদিন সকালে দেখি হারুন ভাই ও অমলেশ ভাই (অমলেশ সেন) আমাদের নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ার বাসায় এসে বাবার সঙ্গে কথা বললেন, আমার সঙ্গেও কথা বললেন। পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিম হাতে গুজে দিয়ে গেলেন। এভাবেই কামাল ভাইয়ের একান্ত ইচ্ছে ও আন্তরিকতায় আবাহনীতে যোগ দিলাম। সেই যে এলাম আবাহনী থেকেই ক্যারিয়ার শেষ করেছি। আমার ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান আমাকে ফুটবলার হিসেবে তৈরি করেছেন আর কামাল ভাইয়ের কল্যাণে আমি আজকের চুন্নু হয়েছি।


অপরূপ বাংলা : যার কথায় আপনি আবাহনীতে চলে এলেন, সেই ‘শেখ কামাল’ এর স্মৃতি সর্ম্পকে কিছু জানতে চাচ্ছিলাম?  
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু : আবাহনী ১৯৭৪ সালে মৌসুম সেরা দল। তারকা ফুটবলারদের ছড়াছড়ি। আবাহনীর জার্সি গায়ে শুরুতে খুব একটা ভাল খেলতে পারছিলাম না। এভাবে প্রথম চার-পাঁচটি ম্যাচ খুবই খারাপ খেললাম। আমার পারফরম্যান্সে কামাল ভাইয়ের বন্ধুরা খুশি হতে পারলেন না। উনার বন্ধুরা বলাবলি করতে লাগলেন, ও তো ভাল খেলছে না। ওরে দিয়ে চলবে না। কি ছেলে নিয়ে এসেছো- টিপু ভাই, গফুর ভাইদের মতো খেলোয়াড় ছেড়ে দিলাম। আমি কথাগুলো কাছাকাছি থেকে শুনতে পেলেও তারা আমাকে দেখেননি। কামাল ভাই তখন হেসে বললেন, দেখো ও’ কিন্তু গত মৌসুমে রহমতগঞ্জের হয়ে ভাল খেলেছে। আবাহনীর বিপক্ষেও গোল করেছে। ও’ কে তো আমি একদিনের জন্য আনিনি। বাচ্চা ছেলে। আমি ও’ কে লম্বা সময়ের জন্য এনেছি। কামাল ভাই ইয়াংদের খুবই পছন্দ করতেন। সেসময় আমাকে, টুটুলকে (শফিউল আরেফিন টুটুল), ফুয়াদকে দলে নিয়ে এসেছিলেন। বন্ধুদের উদ্দেশ্যে সেদিন কামাল ভাই বলেছিলেন, আমি  জহুরি। জহুর চিনতে ভুল করিনি। তোমরা তো ৪/৫ খেলা দেখে জাজমেন্ট করলা। একদিন তোমরাই বলবা, এই ছেলে আবাহনীকে অনেক সার্ভিস দিয়েছে। আমি জহর নিয়ে এসেছি। দেখবা এই ছেলেই একদিন দেশসেরা হবে। কথাগুলো বলতে বলতে ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলেন চুন্নু। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, আমি যতটুকু আবাহনীকে দিয়েছি, দেশের জন্য শ্রম দিয়েছি. মেধা দিয়েছি, যে শৈল্পিক খেলা মানুষকে দিয়েছি কামাল ভাইয়ের জীবদ্দশায় তা দেখাতে পারিনি। এটা আজীবন আফসোসই থেকে যাবে।
অপরূপ বাংলা : ১৯৭৫ সালে যখন জাতীয় দলে প্রথম ডাক পেলেন তখনকার এমন কোনো স্মৃতি কী আপনার মনে পড়ে?    
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু : আমি ১৯৭৫ সালে জাতীয় দলে প্রথম ডাক পাই। দলের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় ছিলাম। মালয়েশিয়ার মারদেকা টুর্নামেন্টে যাবার প্রাক্কালে ২৭ জুলাই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সঙ্গে দলের সবাই দেখা করতে গিয়েছিলাম। উনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখলাম, উনি সবার নাম ধরে ধরে খোঁজখবর নিচ্ছেন। কীরে আশরাফ, কীরে সালাহউদ্দিন তোরা কে কেমন আছিস। জাতীয় দলের হয়ে এটা ছিল আমার প্রথম সফর। আমাদের প্রায় সমবয়সী ছিলেন বাবলু (হাসানুজ্জামান বাবলু), ইউসুফ (মোহাম্মদ ইউসুফ) ও সেলিম। ফটোসেসনের সময় আমি বঙ্গবন্ধুর ঠিক সামনে বসেছিলাম। আমাকে দেখে, কামাল ভাইকে ডাক দিয়ে বলছেন এই কামাল, এতো বাচ্ছা ছেলে- ওকে বিদেশে পাঠাচ্ছিস! এ ছেলে কী খেলবে। আমার মাথায় উনি স্নেহের পরশ রেখে হেসে হেসে কথাগুলো বললেন। পেছনে দাঁড়ানো কামাল ভাই, বঙ্গবন্ধুকে বলছেন, আব্বা ও’ ভাল খেলে। আগামীতে আরো ভাল খেলবে। 
অপরূপ বাংলা : আচ্ছা, ঢাকার মাঠে আপনাকে ‘আড়াই প্যাঁচের জিলাপি’ বলা হতো কেন?
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু : আমি অ্যাটাকিং লেফটউইঙ্গার ছিলাম। আমার কাছে বল এলে পায়ে আঠার মতো লেগে থাকত। ছোট্টবেলায় ডিকবল (টেনিস বল থেকে একটু বড় বল) খেলতে খেলতে বল নিয়ন্ত্রণটা রপ্ত করেছিলাম। সেই সত্তর-আশির দশকে নারায়ণগঞ্জের অলিতে গলিতে ডিকবল দারুণ জনপ্রিয় ছিল। নিয়মিত টুর্নামেন্টও হতো। সামনে প্রতিপক্ষ যারাই থাকতেন আমার কাছ থেকে সহজে বল কেড়ে নিতে পারতেন না। আড়াই থেকে তিন ফুট জায়গায় মধ্যে প্রতিপক্ষ যে কয়জনই হতেন তাদের ডজ দিয়ে বলটা নিজের কাছে রেখে দিতে পারতাম। কিংবা যতক্ষণ পর্যন্ত আমি সর্তীর্থ কাউকে পাস না দিতাম, ততক্ষণ পর্যন্ত বলটা আমার নিয়ন্ত্রণেই থাকত। অল্প জায়গায় প্রতিপক্ষকে জিলাপি প্যাঁচের মতো ঘোল খাওয়াতাম বলেই সেসময় ঢাকার মাঠে সবাই আমাকে ‘আড়াই প্যাঁচের জিলাপি’ ডাকতেন। এটাই এক সময় স্থায়ীত্ব হয়ে যায়।

  
অপরূপ বাংলা : আবাহনীতে তো একটা লম্বা সময় কাটিয়েছেন। এসময় দলকে কতটা সাফল্য এনে দিতে পেরেছিলেন?
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু : ঢাকার মাঠে ফুটবল ক্যারিয়ারের প্রথম দু’ বছর বাদ দিলে আমি একটানা ১৪ বছরই আবাহনীতে খেলেছি। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন, সেখানে একটা লম্বা সময় কাটিয়েছি। সেই ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮৮ সাল। এসময়ে পাঁচবার লিগ চ্যাম্পিয়ন এবং চারবার ফেডারেশন কাপ চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য ছিলাম। এর মধ্যে ১৯৭৯ সালে আবাহনীর অধিনায়ক ছিলাম। আবাহনী থেকে ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ করে পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির ডিরেক্টর ও ফুটবল কমিটির সদস্য সচিব ছিলাম। এছাড়া বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের যুগ্মসম্পাদক এবং বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের উপমহাসচিব ছিলাম। এমন কি, শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব লিমিটেডের ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান ছিলাম। বর্তমানে ফুটবলের নানারকম কর্মকান্ডের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে ঘরোয়া ফুটবল উন্নয়নে কাজ করে চলেছি।      
অপরূপ বাংলা : জাতীয় দলে আপনার অসংখ্য কৃতিত্ব রয়েছে। যেমন স্টাইকার না হয়েও সর্বাধিক গোলদাতার রেকর্ড রয়েছে, একমাত্র হ্যাটট্রিকও দখলে- এ সম্পর্কে কিছু জানতে চাচ্ছিলাম?
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু : আমি ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলের নিয়মিত খেলোয়াড় ছিলাম। জাতীয় দলের জার্সি পড়ে ৫০টি ম্যাচ খেলেছি। এর মধ্যে আমার ১৭টি আন্তর্জাতিক গোল রয়েছে। স্টাইকার না হয়েও জাতীয় দলের হয়ে সর্বাধিক গোল করেছি। এখন পর্যন্ত এই গোলের রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারেননি। এমন কি আন্তর্জাতিক ফুটবলে জাতীয় দলের হয়ে একমাত্র হ্যাটট্রিক করার রেকর্ডটিও আমার দখলে রয়েছে। ১৯৮৩ সালে নেপালের বিপক্ষে ঢাকায় তৃতীয় প্রেসিডেন্ট কাপ গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে হ্যাটট্রিক করেছিলাম। এই রেকর্ডটিও ৪০ বছরে কেউ ভাঙতে পারেননি। এমন কি আমি বিশ^কাপ বাছাই পর্বে বাংলাদেশের প্রথম গোলদাতাও। এটি ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাছাইপর্ব ছিল। যেটি ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এমন কি স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রথম যে জয়টি পেয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলে। জয়সূচক গোলটি আমিই করেছিলাম। প্রথম গোলটি করেছিলেন কায়সার হামিদ। এমন অনেক কিছুতেই আমি প্রথম। 
অপরূপ বাংলা : আপনার শুরুটা তো হয়েছিল গোলরক্ষক হিসেবে, কিন্তু লেফটউইঙ্গার হয়ে উঠলেন কিভাবে?
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু : আপনি ঠিকই বলেছেন। গোলরক্ষক হয়েই শুরু করেছিলাম. ছোট্টবেলায় অনেক পুরস্কারও জিতেছিলাম। আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি, তখন জিমখানা মাঠে ৫০/৬০ জনকে উপমহাদেশের প্রখ্যাত লেফটউইঙ্গার আলাউদ্দিন খান খেলা শেখাতেন। একদিন তাঁর কাছে গিয়ে ফুটবল খেলার আগ্রহ প্রকাশ করলে উনি আমাকে লেফট আউট পজিশনে খেলতে বললেন। আমি বললাম, আমি তো বাঁ পায়ে বলই মারতে পারিনা। বাঁ পা চলে না। খেলবো কীভাবে? আমার এখনো মনে আছে, আলাউদ্দিন খান- আমার ওস্তাদ, ধমক দিয়ে বলেছিলেন ‘যা বলি তাই কর’। এরপর একটি বল দিয়ে বললেন, বাড়ির দেওয়াল থাকলে সেখানে বল পুশ করে করে খেলবি। বললাম, আমাদের তো টিনের ঘর। দেওয়াল পাবো কোথায়? তখন উনি বললেন, রাস্তায় যে দেওয়াল আছে সেখানে শুধু বাম পা দিয়ে বল পুশ করবি। যদি ডান পা ব্যবহার করিস আর আমি দেখি তাহলে তোর ডান পা-ই কেটে ফেলব। আমি দেওয়ালে বল পুশ করতে করতেই বাম পায়ের মাস্টারপিস হয়েছিলাম। আসলে সাধণা করলে সবকিছুই সম্ভব। 
অপরূপ বাংলা : ফুটবল নিয়ে আপনার এমন কোনো স্মৃতি রয়েছে যা আজও ব্যথিত হন?
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু : ফুটবল ক্যারিয়ারে আমার যেমন কিছু স্মরণীয় ঘটনা রয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে কিছু দু:স্মৃতি রয়েছে। যা মনে পড়লে আজও ব্যথিত হই। এ প্রজন্ম হয়ত জানেই না যে, ফুটবল খেলতে গিয়ে এদেশের বেশকিছু বরেণ্য ফুটবলার তৎকালীণ সামরিক শাসনের রোষানলে পড়ে জেল পর্যন্ত খেটেছেন। সেটি ছিল ১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে মারামারির জের ধরে বিনা দোষে আবাহনীর চার ফুটবলারকে জেল খাটতে হয়েছিল। এর মধ্যে আমিও ছিলাম। আমার সঙ্গে ছিলেন কাজী সালাহউদ্দিন, গোলাম রব্বানী হেলাল ও কাজী আনোয়ার। যা ঘরোয়া ফুটবলের কলঙ্কিত দিন হিসেবে ওই দিনকে ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ গণ্য করা হয়।               
অপরূপ বাংলা : বর্তমান ফুটবল আর অতীত ফুটবলের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পান কি?
আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু : সত্যিকার অর্থে অনেক পার্থক্য। প্রথমত আমরা যখন খেলেছি, তখন টাকার এতো ছড়াছড়ি ছিল না। এখন তো এক মৌসুম খেললেই কোটিপতি। দ্বিতীয়ত, আমাদের সময় খুব বেশি বিদেশী কোচিং স্টাফ ছিল না। এখন তো জাতীয় দল পুরো বিদেশী কোচিং স্টাফ নির্ভর। তৃতীয়ত আন্তর্জাতিক ম্যাচ কম খেলেছি। এখন তো অসংখ্য ম্যাচ খেলার সুযোগ পাচ্ছে। চতুর্থ আমাদের সময় মাঠে প্রচুর দর্শক আসতেন। এখন তো গ্যালারিই ভরে না। পঞ্চমত পাশ^বর্তী দেশগুলো এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা ক্রমশ: পিছিয়ে পড়ছি। ষষ্ঠ আগে জেলায় জেলায় মাঠ ছিল, লিগ হত, খেলা হত। এখন তা কমে যাচ্ছে। এমন অনেক অসংখ্য পার্থক্য রয়েছে। তবে আমি মনে করি, বাংলাদেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তা হারিয়ে যায়নি। ভাল ম্যাচ হলে, খেলোয়াড়রা নিজেদের মেলে ধরতে পারলে অবশ্যই ফুটবলের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে। মাঠেও দর্শক ফিরবে।        
                         
     
 
                         

জ.ই

সর্বশেষ

জনপ্রিয়