ছবি : প্রতিনিধি
ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে দেশটির ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোট। তবে নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্য পেলেও তাদের সমর্থন নিতে নারাজ ইসরায়েলের প্রধান ইহুদি রাজনৈতিক দলগুলো।
আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিরোধী বিরোধী জোটের বড় একটি অংশ।
ইসরায়েলের সাম্প্রতিক পার্লামেন্ট নির্বাচনে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হলেও তার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন পায়নি। অন্যদিকে, নিজেদের জায়নবাদী হিসেবে পরিচয় দেওয়া বিরোধী দলগুলোর জোটও সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দূরে রয়েছে।
তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে যোগ্য ফিলিস্তিনি ভোটারদের প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এতে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান দুই রাজনৈতিক জোট ইউনাইটেড আরব লিস্ট (রাআম) ও জয়েন্ট লিস্ট সম্মিলিতভাবে ১২০ সদস্যের পার্লামেন্টে ১৯টি আসন পেয়েছে। ফলে সরকার গঠনে তাদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু ফিলিস্তিনি ভোটারদের এই অংশগ্রহণকে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে ইসরায়েলের শীর্ষ রাজনীতিকদের অনেকে তাদের ভোটের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ একে বিদেশি হস্তক্ষেপের ফল হিসেবে তুলে ধরছেন, আবার ফিলিস্তিনিদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগকে নির্বাচন ছিনতাইয়ের চেষ্টা হিসেবেও আখ্যা দিচ্ছেন।
আরবদের ভোটের মূল্য নেই
নির্বাচনের ফলাফলকে ইসরায়েলের ‘ইসলামায়নের’ প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতকে ফিলিস্তিনি ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতির পেছনে বিদেশি হস্তক্ষেপ ছিল কি না, তা তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আরব ভোটের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আরব দলগুলোর জোট গঠনের সম্ভাবনাও জটিল করে তোলা হয়েছে।
নেতানিয়াহু সরকারের দুর্নীতি, অদক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার সমালোচনা করলেও দেশটির ইহুদিপ্রধান বিরোধী দলগুলোর বড় অংশ ফিলিস্তিনি দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে অনাগ্রহী।
বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টি ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতায় সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের অন্য নেতারা এমন জোটের বিরোধিতা করেছেন অথবা ফিলিস্তিনি ভোটারদের উপস্থিতির পেছনে বিদেশি শক্তির ভূমিকা থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা থেকে বিরত থেকেছেন।
নির্বাচনের রাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদ ফিলিস্তিনি দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। অথচ ২০২১-২২ সালে তাদের নেতৃত্বাধীন স্বল্পস্থায়ী সরকার ফিলিস্তিনি দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
বৃহস্পতিবার বিরোধী শিবিরের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও কট্টর ডানপন্থি ইসরায়েল বেইতেনু পার্টির প্রধান আভিগদর লিবারম্যানও ফিলিস্তিনি দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ‘বিবি বা তিবি—কারও সঙ্গেই বসব না।’ এখানে ‘বিবি’ বলতে নেতানিয়াহু এবং ‘তিবি’ বলতে জয়েন্ট লিস্টের অংশ তাআল পার্টির নেতা আহমেদ তিবিকে বোঝানো হয়েছে।
ফিলিস্তিনিপ্রধান বালাদ পার্টির হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া অরলি বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই বড় ধরনের ভোটার উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। গাজায় ইসরায়েলি সরকারের কর্মকাণ্ড এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ ছিল। পাশাপাশি অপরাধের ঊর্ধ্বগতি ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন পুলিশের কার্যক্রম নিয়েও মানুষের অসন্তোষ ছিল।
তিনি বলেন, ৭ অক্টোবরের পর থেকে ফিলিস্তিনিদের যেটুকু অধিকার ছিল, তা-ও ক্রমে সংকুচিত হয়েছে। তাদের হাতে থাকা শেষ হাতিয়ার ছিল ভোটাধিকার, যেখানে অন্য সবার সঙ্গে তাদের সমান অধিকার রয়েছে। তাই তারা ব্যাপকভাবে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এখন সেই ভোটের বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।
সব ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুপন্থী জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু বিরোধী ইহুদি দলগুলোর জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। ফিলিস্তিনি দলগুলোর ১৯টি আসন যোগ করলে পার্লামেন্টে নেতানিয়াহু বিরোধী সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হয়।
নয় বলেন, অন্য কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এমন ফলাফল হলে একে বিরোধী পক্ষের বড় বিজয় এবং নেতানিয়াহুর প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ইসরায়েলে বিষয়টিকে তিনটি পৃথক রাজনৈতিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
তার ভাষ্য, বিরোধী দলের কিছু নেতা এখন নেতানিয়াহুর সঙ্গে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের কথা বলছেন। আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট না করে নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমঝোতার এই প্রবণতা দলগুলোর বর্ণবাদী মনোভাব ও গণতন্ত্রবিরোধী অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ।
ভবিষ্যৎ ইসরায়েল নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
ইসরায়েলের ইহুদি প্রধান বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে ফিলিস্তিনি সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে। বিরোধী দলগুলোর একটি বড় অংশ নিজেদের জায়নবাদী পরিচয়ে রাজনীতি করে। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি নাগরিকরা সমান জাতীয় ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন। এই দুই অবস্থানের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গ বলেন, ইসরায়েলের মূলধারার রাজনীতির বড় অংশই ইহুদিদের আধিপত্যের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ কারণে আরব ভোটকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০১৮ সালের নেশন স্টেট আইনেও এই বৈষম্যের প্রতিফলন রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। ওই আইনে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার শুধু ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফ্লাশেনবার্গ বলেন, ইসরায়েলের নাগরিক হওয়ার অর্থ কী, দেশটি কীভাবে পরিচালিত হবে এবং কার স্বার্থে পরিচালিত হবে—এসব বিষয়ে দুই পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। তবে এসব মৌলিক মতপার্থক্যের আড়ালে থাকা বর্ণবাদকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
জয়েন্ট লিস্টের হিব্রু ভাষার নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালক মরিসিও ল্যাপচিক বলেন, ইসরায়েলের রাজনৈতিক দলগুলো শুধু ইহুদিদের সমর্থন নিয়েই সরকার গঠন করতে চায়।
তিনি বলেন, অন্য কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এমন নির্বাচনী ফল হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও একটি পক্ষকে বিজয়ী হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার কথা ভাবাই কঠিন হতো। কিন্তু ইসরায়েলে আরবদের কণ্ঠস্বরকে ইহুদিদের কণ্ঠস্বরের সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এ কারণেই আমরা একে বিজয় বলতে পারছি না।
সূত্র: আল-জাজিরা





