ফাইল ছবি
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও ব্যাংকঋণের চাহিদা বাড়াতে নতুন মুদ্রানীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপরে থাকলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ রয়েছে ৫ শতাংশের নিচে। ফলে মূল্যস্ফীতি কমানোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানো এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোই নতুন মুদ্রানীতির অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। প্রথমবারের মতো ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাস—অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—সময়কালের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তিন মাস পরপর মুদ্রানীতি ঘোষণার প্রস্তাব ছিল। বিষয়টি পর্যালোচনা করে তিন মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন মুদ্রানীতিতে কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি ও বেসরকারি বিনিয়োগ দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই দুটি বিষয় নিয়েই কাজ করে। তাই মূল্যস্ফীতি ও বেসরকারি বিনিয়োগকে সমন্বয় করেই নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা হবে।’
এতদিন বাংলাদেশ ব্যাংক বছরে দুইবার—জানুয়ারি-জুন এবং জুলাই-ডিসেম্বর—মেয়াদে মুদ্রানীতি ঘোষণা করত। এবার তিন মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণার মাধ্যমে সেই ধারায় পরিবর্তন আসছে।
বেসরকারি ঋণে ধীরগতি
বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশে। জুনে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। জুনের প্রবৃদ্ধিই ছিল রেকর্ড সর্বনিম্ন।
ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদের কারণে ঋণের চাহিদা কমেছে। ব্যাংকগুলোতে তারল্য থাকলেও নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কম থাকায় সেই অর্থের বড় অংশ উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না।
বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফেরাতে গত ২ আগস্ট নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণের ব্যয় কমিয়ে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে এরপরও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের ওপরে ওঠেনি।
৮ শতাংশের ওপরে মূল্যস্ফীতি
অন্যদিকে দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমলেও তা এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে। জুলাইয়ে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যালোচনাতেও মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তা এখনো সরকারের ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি দামের ওঠানামা ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ-আন্তর্জাতিক ঝুঁকি মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি কমানোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়াতে কতটা সুযোগ রাখা হবে, সেটিই নতুন মুদ্রানীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমান নীতি সুদহার বহাল রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সরকারের সম্ভাব্য প্রণোদনা কর্মসূচি, বিভিন্ন খাতে তারল্য সহায়তা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার ফলে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত তারল্য তৈরি হতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
কেন তিন মাসের মুদ্রানীতি
অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সঙ্গে নীতিগত সিদ্ধান্ত দ্রুত সমন্বয়ের লক্ষ্যেই তিন মাস পরপর মুদ্রানীতি ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি, ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ ও তারল্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তুলনামূলক দ্রুত নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।
এর আগে জাতীয় সংসদের একটি কমিটিতেও বছরে চারবার মুদ্রানীতি ঘোষণার প্রস্তাব এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বল্পমেয়াদি মুদ্রানীতি ঘোষণার ফলে অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত অবস্থান সমন্বয়ের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তন বাজারে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির দ্বৈত চ্যালেঞ্জ
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার পাশাপাশি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সরকারের লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আসন্ন অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি সেই লক্ষ্যের চেয়ে প্রায় দশমিক ৭৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
ফলে আগামী তিন মাসের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার, তারল্য ব্যবস্থাপনা ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কী অবস্থান নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিসংশ্লিষ্ট মহলের।
ম.র





