বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ , ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

Aporup Bangla

৭৫-এ থেমে গেলেন প্রখ্যাত এই অভিনেতা

পর্দার ‘ক্রান্তিবীর’ থেকে কৃষকের বন্ধু, নানা পাটেকরের অন্য জীবন

সারাবিশ্ব

বিনোদন প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১০:০১, ৮ অক্টোবর ২০২৬

আপডেট: ১০:০১, ৮ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ

পর্দার ‘ক্রান্তিবীর’ থেকে কৃষকের বন্ধু, নানা পাটেকরের অন্য জীবন

প্রয়াত অভিনেতা নানা পাটেকর

ভারতীয় চলচ্চিত্রে নানা পাটেকর ছিলেন এক অনন্য নাম। কখনো তীব্র সংলাপ আর শক্তিশালী অভিনয়ে দর্শককে নাড়া দিয়েছেন, কখনো খলনায়কের চরিত্রে ভয় ধরিয়েছেন। তবে রুপালি পর্দার বাইরের নানা পাটেকর ছিলেন একেবারেই অন্যরকম—সাদামাটা জীবনযাপন, দেশপ্রেম এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য যিনি হয়ে উঠেছিলেন অনুপ্রেরণার প্রতীক।

নানা পাটেকরের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম তার। শৈশব কেটেছে আর্থিক সংকটের মধ্যে। মুম্বাইয়ের স্যার জে. জে. স্কুল অব অ্যাপ্লায়েড আর্ট থেকে পড়াশোনা শেষ করে থিয়েটারের মাধ্যমে অভিনয়জীবন শুরু করেন তিনি।

১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হলেও নিজের স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলীর জন্য পরিচিতি পেতে তাকে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়। আশির দশকের শেষভাগে একের পর এক শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয় করে বলিউডে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন তিনি।

১৯৮৯ সালের ‘পরিন্দা’ এবং ১৯৯৪ সালের ‘ক্রান্তিবীর’ তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় চলচ্চিত্র। বিশেষ করে ‘ক্রান্তিবীর’-এর অভিনয় তাকে দর্শকের কাছে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা ও শ্রেষ্ঠ খলনায়ক—তিন ভিন্ন বিভাগে পুরস্কার জেতার বিরল কীর্তিও রয়েছে তার ঝুলিতে।

চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।

তবে নানা পাটেকরের পরিচয় শুধু অভিনেতা হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের প্রতি তার গভীর টান ছিল। ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সময় মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের সেনাদের সঙ্গে কাজ করেন এবং সীমান্তে গিয়ে তাদের মনোবল বাড়াতে ভূমিকা রাখেন। পরে তিনি অনারারি ক্যাপ্টেন পদমর্যাদাও লাভ করেন।

মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার আরেক বড় অধ্যায় শুরু হয় মহারাষ্ট্রের কৃষকদের দুর্দশার সময়ে।

২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, ঋণের বোঝা এবং ফসলহানির কারণে কৃষকদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়। এই পরিস্থিতি নানা পাটেকরকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। অভিনেতা মকরন্দ আনাসপুরের সঙ্গে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাআম ফাউন্ডেশন’।

কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোই হয়ে ওঠে এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কৃষক আত্মহত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি খরাপীড়িত এলাকায় পানি সংরক্ষণ, নদী ও জলাধার পুনর্খনন এবং বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরিতে কাজ করে সংগঠনটি।

কৃষকদের শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা তৈরির মাধ্যমে তাদের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনার চেষ্টা চালানো হয়।

নিজে তারকা হয়েও ব্যক্তিজীবনে নানা পাটেকর ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ। বিপুল অর্থ-খ্যাতির মালিক হয়েও বিলাসী জীবনযাপনের বদলে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন তিনি। মায়ের সঙ্গে মুম্বাইয়ের সাধারণ একটি ফ্ল্যাটে বসবাসের বিষয়টিও তার সেই সরল জীবনযাপনের উদাহরণ হিসেবে বারবার উঠে এসেছে।

নানা পাটেকরের কাছে তারকা হওয়া মানে শুধু পর্দায় মানুষের বিনোদন দেওয়া ছিল না। তার কাজের বড় একটি অংশ ছিল মানুষের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো। কৃষকের সংকট, সেনাদের মনোবল কিংবা সাধারণ মানুষের দুর্দশা—বিভিন্ন সময়ে তিনি নিজের অবস্থান থেকে মানুষের জন্য কাজ করার চেষ্টা করেছেন।

অভিনয়ের জগতে তিনি ছিলেন ‘ক্রান্তিবীর’; বাস্তব জীবনে কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে হয়ে উঠেছিলেন তাদের একজন আপনজন। তাই নানা পাটেকরের জীবনকে শুধু একজন সফল অভিনেতার গল্প হিসেবে দেখলে তার একটি বড় অধ্যায়ই অদেখা থেকে যায়।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে গোয়ার নিজ বাড়িতে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন নানা পাটেকর। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।

রুপালি পর্দার শক্তিমান এই অভিনেতার চলে যাওয়ায় ভারতীয় চলচ্চিত্র হারাল এক স্বতন্ত্র শিল্পীকে। আর সাধারণ মানুষ হারাল এমন এক তারকাকে, যিনি খ্যাতির আলো পেরিয়ে বাস্তব জীবনের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।

ম.র

সর্বশেষ

জনপ্রিয়